পরিবেশবান্ধব চামড়া কারখানা সুপারেক্স বন্ধের ঝুঁকিতে

২০১৬ সালে খুলনার ফুলতলা উপজেলার উত্তরডিহি গ্রামে পরিবেশবান্ধব চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা সুপারেক্স লেদার প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা কারখানাটিকে ২০২৩ সালে পরিবেশবান্ধব সনদ দেয় আন্তর্জাতিক লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি)। ইতালি, পর্তুগাল, স্পেন, তাইওয়ান ও জাপানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মাসে গড়ে ৮ থেকে ১০ লাখ বর্গফুট চামড়া রপ্তানি করত প্রতিষ্ঠানটি।

করোনার পর থেকে রপ্তানি কার্যক্রমে ছন্দপতন ঘটে। অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েও পরে সরে আসে বিনিয়োগকারী ইসলামী ব্যাংক। এর মধ্যে চামড়ার দরপতনে প্রায় ৮০ কোটি টাকা লোকসানের মুখে পড়ে সুপারেক্স। ভুয়া ঋণপত্রের মাধ্যমে পণ্য পাঠিয়ে আটকে যায় আরও ২৮ কোটি টাকা। এসব সংকট মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংকের কাছে ৩০০ কোটি টাকা পুনর্বিনিয়োগের আবেদন করলেও সাড়া পায়নি।

ব্যাংকের সহযোগিতা না পেয়ে উদ্যোক্তা তাঁর অন্য রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান সুপার জুট মিলের অর্থ চামড়া কারখানায় বিনিয়োগ করেন। তবে চামড়ার চাহিদা কমে যাওয়ায় এখন উভয় প্রতিষ্ঠানই সংকটে পড়েছে। ইসলামী ব্যাংকের কাছ থেকে নেওয়া ২৮৬ কোটি টাকার ঋণ সুদে-আসলে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩০ কোটি টাকায়। ব্যাংক এখন কারখানাটি বিক্রি করে ঋণ পরিশোধের চাপ দিচ্ছে। এতে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে সুপারেক্স।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ৪০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা কারখানা এলাকায় ১৫ একরজুড়ে রয়েছে ফলের বাগান। লাল সিরামিকের কারুকাজে তৈরি চার লাখ বর্গফুটের বিশাল স্থাপনাটিকে বাইরে থেকে কারখানা বলে মনেই হয় না। প্রশাসনিক ভবন ও অতিথিদের থাকার ব্যবস্থাও নান্দনিক নকশায় তৈরি। প্রধান ফটক দিয়ে বাম দিকে রয়েছে কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র। পুরো কারখানায় ইতালীয় যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে রয়েছে বিশাল হিমাগার, যেখানে একসঙ্গে পাঁচ লাখ গরু ও দুই লাখ ছাগলের চামড়া সংরক্ষণ করা সম্ভব। এক একর জায়গাজুড়ে রয়েছে বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি)। কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, কারখানাটিতে প্রতিদিন এক লাখ বর্গফুট চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব। কিন্তু মূলধন ও ক্রয়াদেশের অভাবে বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ২০ হাজার বর্গফুট।

সংকটের শুরু

সুপারেক্স লেদারের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফিরোজ আহমেদ ভূইয়া বলেন, পাটের সুতা রপ্তানি ছিল তাঁর মূল ব্যবসা। তাঁর সাগর জুট মিল তিনবার রপ্তানি ট্রফি পেয়েছে। ২০১৬ সালে জুট মিল পরিদর্শনে এসে ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাঁকে নতুন আরেকটি কারখানা নির্মাণের প্রস্তাব দেন। সেই প্রস্তাব অনুযায়ী তিনি কাজ শুরু করেন।

ফিরোজ আহমেদ ভূইয়ার ভাষ্য, ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংক এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর তাঁর বিনিয়োগ কার্যক্রম পিছিয়ে পড়ে। নিজের জমানো টাকা ও জুট মিলের ঋণের অর্থ দিয়ে তিনি কাজ চালিয়ে যান। পরে কয়েক ধাপে ব্যাংক থেকে ২৮৬ কোটি টাকা পান। তবে পুরো কারখানা নির্মাণে তাঁর ব্যয় হয় প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। তিনি বলেন, কারখানা নির্মাণ শেষ হলেও কাঁচা চামড়া ও পাট কেনার মতো অর্থ তাঁর হাতে ছিল না। সে সময় ব্যাংক অর্থায়ন করলে ব্যবসাটি টিকে যেত। এখন ব্যাংক কারখানা বিক্রি করে দেওয়ার কথা বলছে। তাঁর দাবি, প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করতে চাইলে ক্রেতার অভাব হবে না। তবে নিজের হাতে গড়া কারখানা বিক্রি করে দিতে হলে তা সবার জন্যই লজ্জার বিষয় হবে।

ইসলামী ব্যাংকের খুলনা অঞ্চলপ্রধান মিজানুর রহমান জানান, ওই সময় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কী আলোচনা হয়েছিল, তা তাঁদের জানা নেই। দীর্ঘদিন ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করায় গ্রাহককে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ অবস্থায় নতুন করে ঋণ দেওয়ার সুযোগ নেই। ব্যাংক স্বাভাবিক নিয়মে ঋণের অর্থ আদায়ের চেষ্টা করছে।

উদ্যোক্তার প্রস্তাব

ফিরোজ আহমেদ ভূইয়া বলেন, বিশ্ববাজারে প্রক্রিয়াজাত চামড়ার চাহিদা কিছুটা কমলেও চামড়াজাত পণ্যের দাম বাড়ছে। তাঁর কারখানা থেকে প্রতি মাসে ১২০ কোটি টাকার চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করা সম্ভব। জমি ও অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলেও বিনিয়োগের অর্থ নেই। ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের জন্য কয়েক বছর ধরে ব্যাংকের দ্বারস্থ হয়েও কোনো ফল পাননি তিনি। তিনি আরও বলেন, এলডব্লিউজি সনদ থাকায় এবং পরিবেশবান্ধব কারখানা হিসেবে সুপারেক্সের আন্তর্জাতিক বাজারে সুনাম রয়েছে। বাংলাদেশে অল্প কয়েকটি কারখানার এ সনদ রয়েছে। বিশ্বের কয়েকটি নামকরা প্রতিষ্ঠান ও পুরোনো ক্রেতা চামড়ার ব্যাগসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের প্রস্তাব দিচ্ছে। তাঁর ধারণা, বিনিয়োগ পেলে অন্যান্য অনেক কারখানার তুলনায় বেশি ক্রয়াদেশ পাওয়া সম্ভব হবে এবং আরও ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

উদ্যোক্তার দাবি, ব্যাংক ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করলে পাঁচ বছরের মধ্যে পুরো অর্থ ফেরত দেওয়া সম্ভব। কিন্তু ব্যাংক সেই সুযোগ দিচ্ছে না। অন্যদিকে, ইসলামী ব্যাংকের দৌলতপুর শাখার ব্যবস্থাপক ইফতেখার হোসেন আল মামুন বলেন, সুপারেক্স লেদার ও সুপার জুট মিল—দুটি প্রতিষ্ঠানই খেলাপি। নতুন করে বিনিয়োগ করলে অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে। এ কারণে ব্যাংক এখন ঋণ আদায়কে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।