দুই বছরে গাড়ির টায়ার আমদানি ৫০% বেড়েছে

দেশে হঠাৎ করেই গাড়ির টায়ার আমদানি বেড়ে গেছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে। দেশে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান টায়ার উৎপাদন করলেও বছর দুয়েক আগে গাজী গ্রুপের কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে। দেশীয় কারখানায় উৎপাদন বাড়লেও কমছে না টায়ার আমদানি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যানুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি, বাস ও ট্রাকের ৬৪ লাখ টায়ার আমদানি হয়েছিল। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে ৯৬ লাখে দাঁড়িয়েছে।

বিদেশ থেকে টায়ার আমদানি বেড়ে যাওয়ায় আমদানি খরচও বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে টায়ার আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ২ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে টায়ার আমদানিতে খরচ বেড়েছে ৪২৪ কোটি টাকা। খাতসংশ্লিষ্ট একাধিক উদ্যোক্তা জানান, দেশীয় টায়ার উৎপাদনকারীদের মধ্যে গাজী গ্রুপের অংশ ছিল সবচেয়ে বেশি। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি আর উৎপাদনে নেই। তাদের উৎপাদনের ঘাটতি অন্য কারখানাগুলো পুরোপুরি পূরণ করতে না পারায় টায়ার আমদানি বাড়ছে।

জানা যায়, দেশে বর্তমানে মেঘনা গ্রুপ, প্রাণ-আরএফএল, রূপসা টায়ারস অ্যান্ড কেমিক্যালস, এপেক্স হোসেন টায়ার, যমুনা গ্রুপসহ কয়েকটি কোম্পানি টায়ার উৎপাদন করে। কোম্পানিগুলো রিকশা, ভ্যান ও বাইসাইকেলের টায়ার বেশি উৎপাদন করে। তবে মোটরসাইকেল, সিএনজি ও পিকআপের টায়ারও তৈরি হচ্ছে এসব কারখানায়। এনবিআরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ২০২৩-২৪ অর্থবছর ৩৯ লাখ পিস বাস-ট্রাকের টায়ার আমদানি হয়েছিল। গত অর্থবছর সেটি বেড়ে ৫৭ লাখ ৫১ হাজারে দাঁড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমদানি বেড়েছে ৪৭ শতাংশ।

মোটরসাইকেলের টায়ার আমদানি বেড়েছে ৪৯ শতাংশ। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭ লাখ ৬৩ হাজার মোটরসাইকেলের টায়ার আমদানি হয়েছিল। গত অর্থবছর সেটি বেড়ে হয়েছে ১১ লাখ ৪১ হাজার পিস। এ ছাড়া বাইসাইকেলের টায়ার আমদানি বেড়েছে ৬৪ শতাংশ। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১০ লাখ ৫৫ হাজার বাইসাইকেলের টায়ার আমদানি হয়েছিল। গত অর্থবছর সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ পিসে।

আগে রিকশা, তিন চাকার যান ও ছোট বাণিজ্যিক যানবাহনে ব্যবহৃত টায়ারের মোট চাহিদার ৭০ শতাংশ পূরণ করত গাজী টায়ার। এ ছাড়া বাস ও ট্রাকের টায়ারের বাজারের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ এবং মিনিবাসের ৬৫ শতাংশ টায়ারের চাহিদা গাজী টায়ার পূরণ করত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গাজী টায়ারের দুই কারখানায় লুট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। গাজী গ্রুপের মালিকানায় রয়েছেন আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী। হামলা ও অগ্নিসংযোগের পর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও উৎপাদনে ফিরতে পারেনি গাজী গ্রুপের দুই টায়ার কারখানা।

গাজী টায়ারের কারখানায় বছরে ৪৫-৫০ লাখ টায়ার ও টিউব উৎপাদন সক্ষমতা ছিল। দেশের বাজারে রিকশা ভ্যানের টায়ারের প্রায় অর্ধেক এবং বাস-ট্রাক ও অটোর টায়ার-টিউবের প্রায় ৪০ শতাংশ তাদের দখলে ছিল। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪৯১ কোটি টাকার টায়ার-টিউব বিক্রি করেছিল গাজী টায়ারের দুই প্রতিষ্ঠান-গাজী টায়ার ও গাজী অটো টায়ার। জানা যায়, উৎপাদনে ফিরতে না পারলেও আমদানি করে ব্যবসায় টিকে থাকার চেষ্টা করছে গাজী টায়ার ও গাজী অটো টায়ার।

আরএফএল গ্রুপ তাদের হবিগঞ্জ শিল্পপার্কে রিকশা, ভ্যান, মোটরসাইকেল, ইজিবাইক, সিএনজি, মিশুক এবং দেড় টনের ট্রাকের টায়ার উৎপাদন করে। মাসে তাদের ৮ লাখ পিস টায়ার উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে এই শিল্পগ্রুপ যেসব টায়ার উৎপাদন করে, তার ৮০ শতাংশই সাইকেল, রিকশা ও ভ্যানের টায়ার। চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাস ও ট্রাকের টায়ার উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে আরএফএল গ্রুপ—এমন তথ্য দিয়ে শিল্পগোষ্ঠীটির বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ‘আমরা বাজারে চাহিদা বিশ্লেষণ করে দেখছি। ইতিবাচক ফিডব্যাক পেলে দ্রুতই উৎপাদনে যাব।’

টায়ার আমদানি কেন বাড়ছে জানতে চাইলে কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ‘রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত অটোরিকশার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। সে তুলনায় উৎপাদন খুব বেশি বাড়েনি। আর্থসামাজিক পরিস্থিতির কারণে গত দুই বছরে এ খাতে তেমন বিনিয়োগও হয়নি। আবার টায়ার উৎপাদনে গ্যাসের প্রয়োজন হয়। সব মিলিয়ে আমরা কিছুটা পিছিয়ে রয়েছি।’ ১৯৯১ সালে টায়ারের ব্যবসায় নামে রূপসা টায়ারস অ্যান্ড কেমিক্যালস। ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি রিকশা, ভ্যান ও বাইসাইকেলের টায়ার উৎপাদন করত। এরপর মোটরচালিত যান, বিশেষ করে মোটরসাইকেল ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার টায়ার উৎপাদন শুরু করে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির দৈনিক ৮ হাজার টায়ার ও ৩০ হাজার টিউব উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। দুই বছর আগে তাদের উৎপাদন সক্ষমতা ছিল প্রায় ৩০ শতাংশ কম।

জানতে চাইলে রূপসা টায়ারসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মিরাজ রহমান বলেন, মোটরসাইকেল টায়ারের বাজার বড় হচ্ছে। বাজার চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে দেশীয় কোম্পানিগুলোর উৎপাদন সক্ষমতাও বেড়েছে। একইভাবে বিদেশি টায়ারও প্রচুর আসছে। তার অন্যতম কারণ ভারতীয় মোটরসাইকেল দেশে উৎপাদন হচ্ছে। তারা ভারত থেকে টায়ার নিয়ে আসছে। আবার ক্রেতাদের মধ্যে বিদেশি টায়ারের চাহিদা বেশি। মিরাজ রহমান আরও বলেন, ‘বাস-ট্রাকের টায়ার উৎপাদনে প্রচুর বিনিয়োগ করতে হয়। তবে সে অনুযায়ী আমাদের বাজার অত বড় নয়। তবে চলতি অর্থবছরের বাজেটে পিকআপ ও মিনিবাসের টায়ার আমদানিতে কর বৃদ্ধি করেছে সরকার। আমরা এখন এই দুই ধরনের টায়ারের উৎপাদনে বিনিয়োগ করব।’