চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই রাজস্ব আদায়ে হোঁচট খেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। কর্মকর্তাদের মতে, চলতি অর্থবছরে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বা মূসক রিটার্ন দাখিলের নতুন নিয়ম চালু করায় রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আগে ব্যবসায়ীদের প্রতি মাসে রিটার্ন জমা দিতে হতো। কিন্তু তিন মাস অন্তর ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ চালু হওয়ায় অনেকে জুলাই ও আগস্টে রিটার্ন জমা দেননি। ফলে সেপ্টেম্বরে ভ্যাট আদায় কমে যায়। এ পরিস্থিতিতে সম্প্রতি ত্রৈমাসিক ভ্যাট রিটার্নের নিয়ম থেকে সরে এসে আগের পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
তবে এনবিআরের কয়েকজন কর্মকর্তা মনে করেন, শুধু ত্রৈমাসিক ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের নিয়ম চালুর কারণেই রাজস্ব আদায় কমেনি। এর পেছনে সংস্থাটির বর্তমান প্রশাসনের দুর্বল ব্যবস্থাপনাও দায়ী। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কর্মতৎপরতার ঘাটতি রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবেও রাজস্ব আদায় কম হচ্ছে। অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা ও বহুমুখী চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে এ পরিস্থিতির সামগ্রিক মূল্যায়ন প্রয়োজন। কারণ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্থনীতি বর্তমানে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। ফলে বাজেটে রাজস্ব আদায়ে যে বড় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জন করা কঠিন হবে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৯২ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায় কম হয়েছে ৪১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল ৯১ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। সে হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রাজস্ব আদায় বেড়েছে ১ দশমিক ২৩ শতাংশ। এ ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরের বিশাল রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ভ্যাট থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৯ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ২৯ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা। ফলে এ খাতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৫৭ কোটি টাকা।
অন্যদিকে আয়কর ও ভ্রমণ কর থেকে রাজস্ব আদায় বেড়েছে। প্রথম তিন মাসে এ খাত থেকে আদায় হয়েছে ৩৩ হাজার ৪০ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪২ হাজার ৭২৬ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি রয়েছে ৯ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। ঘাটতি থাকলেও গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ খাত থেকে রাজস্ব আদায় বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ। আমদানি-রপ্তানি পর্যায়ে শুল্ককর থেকে আদায় হয়েছে ৩০ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। এ খাতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪২ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। তবে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ খাতে রাজস্ব আদায় বেড়েছে সাড়ে ৭ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে এনবিআরের মাধ্যমে মোট ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এর মধ্যে ভ্যাট থেকে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। গত ১০ থেকে ১২ বছর ধরে এনবিআরের তিনটি অনুবিভাগের মধ্যে ভ্যাট রাজস্ব আহরণের প্রধান খাত হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কিন্তু এ খাতে রাজস্ব আদায়ের বড় ঘাটতি এনবিআরের সামগ্রিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শুধু ভ্যাট আদায়ের পদ্ধতি পরিবর্তন নয়, বিনিয়োগে স্থবিরতা, ব্যাংকঋণ বিতরণ কমে যাওয়া এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণেও রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন ধীর হওয়ায় সেখান থেকেও পর্যাপ্ত ভ্যাট ও কর আদায় হচ্ছে না। তিনি বলেন, অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে মন্থরগতি এবং রাজস্ব আদায়ে বড় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য এনবিআরকে আরও উদ্যম ও তৎপরতার সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির প্রধান কারণ ভ্যাট। পরীক্ষামূলকভাবে তিন মাস অন্তর ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এ খাত থেকে আদায় কম হয়েছে। তবে রাজস্ব আদায়ে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
