শিল্পগোষ্ঠী ট্রান্সকম গ্রুপের প্রায় ১২০ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকির প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভ্যাট নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। অভিযোগ রয়েছে, জরিমানা এড়াতে তদন্ত চলাকালেই কৌশলে ভ্যাট নিবন্ধন সংশোধন করে প্রতিষ্ঠানটি। এতে তাদের প্রকৃত ভ্যাট দায় নির্ধারণে বিষয়টি ভ্যাট নীতি বিভাগের কাছে পাঠানো হয়। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর এক বছর পার হলেও কার্যত কোনো অগ্রগতি হয়নি; বরং ভ্যাট নীতি বিভাগ ও তদন্ত অধিদফতরের মধ্যে প্রায় সাত মাস ধরে চিঠি চালাচালিতেই সময় কেটেছে। নতুন অর্থবছর শুরু হলেও বকেয়া অর্থ আদায়ে নেওয়া হয়নি কোনো কার্যকর উদ্যোগ। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এনবিআরের এই গাফিলতির সুযোগে ট্রান্সকমের ভ্যাট ফাঁকির ঘটনা আইনের ফাঁক গলে এড়িয়ে যেতে পারে।
জানা গেছে, আমদানি ও রফতানির উদ্দেশে দক্ষিণ কমলাপুরের ঠিকানায় ট্রান্সকম লিমিটেড নামে ভ্যাট নিবন্ধন নেয় প্রতিষ্ঠানটি। ভ্যাট গোয়েন্দা ও নিরীক্ষার একটি দল ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠানটিতে অনুসন্ধান শুরু করে। ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সব কার্যক্রমের ওপর চলে এই নিরীক্ষা। পরে অনুসন্ধান দলটি ২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। সেই প্রতিবেদনেই ধরা পড়ে ট্রান্সকমের বড় অঙ্কের ভ্যাট ফাঁকির ঘটনা।
নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরই গত বছরের ১৬ এপ্রিল ট্রান্সকমকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় অধিদফতর। অভিযোগ রয়েছে, ভ্যাট ফাঁকি এড়াতে প্রতিষ্ঠানটি তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা হিসেবে ভ্যাট নিবন্ধন সংশোধন করে—যা তাদের নিজস্ব চিঠিতেও উল্লেখ আছে। এর ফলে যেখানে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দেওয়ার কথা, সেখানে গত বছরের মে মাস থেকে তারা মাত্র ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট জমা দিতে শুরু করে। এতে সুদসহ সরকারের রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬২ কোটি ৫৯ লাখ টাকার বেশি। অন্যদিকে, এই কৌশল না নিলে তদন্তে চিহ্নিত দাবির ভিত্তিতে ট্রান্সকমকে পরিশোধ করতে হতো ১২০ কোটি ৩০ লাখ টাকারও বেশি। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ভ্যাট ফাঁকির উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠানটি হিসাবপত্রে ‘ম্যানেজমেন্ট এক্সপেন্স’ নামে একটি খাত ব্যবহার করেছে। যদিও নামটি ব্যয়ের খাত, বাস্তবে এটি কোনো ব্যয় নয়; বরং এখানে তাদের আয়ের অর্থ দেখানো হয়েছে। তদন্ত চলাকালীন দ্রুততার সঙ্গে ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট পরিশোধ করে সংশ্লিষ্ট দাখিলপত্রও জমা দেয় প্রতিষ্ঠানটি, যা পুরো প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
গত বছরের ২৬ জুন ট্রান্সকম লিখিতভাবে কারণ দর্শানোর জবাব দেয় এবং ৯ সেপ্টেম্বর শুনানিতে অংশ নেয়। এরপর অভিযোগ থেকে দায় এড়াতে প্রতিষ্ঠানটি ১৫ শতাংশ ভ্যাটের পরিবর্তে নিজেদের সেবাকে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর হিসেবে উপস্থাপন করে ২৮ সেপ্টেম্বর আবারও লিখিত ব্যাখ্যা জমা দেয়। চিঠিতে তারা দাবি করে, তাদের সিএ ফার্মের নিরীক্ষিত হিসাবে ‘ম্যানেজমেন্ট এক্সপেন্স’ হিসেবে দেখানো হলেও বাস্তবে এটি আইটি সাপোর্ট সার্ভিস, যা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবার আওতায় পড়ে। সে অনুযায়ী এনবিআরের ভ্যাট আইন অনুসারে ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট প্রযোজ্য বলে তারা যুক্তি দেয়। এ কারণে ওই বছরের মে মাসের বকেয়া হিসেবে প্রায় পৌনে সাত কোটি টাকা ভ্যাট পরিশোধ করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। এছাড়া, যে ভ্যাট কমিশনারেটের অধীনে এই অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে, সেখান থেকেও কোনো আপত্তি জানানো হয়নি বলে দাবি করে ট্রান্সকম। সবশেষে, এনবিআরের আগের দাবিনামা সংশোধন করে নতুন করে দাবিনামা জারি করার অনুরোধ জানায় প্রতিষ্ঠানটি।
চিঠিতে ট্রান্সকম উল্লেখ করে, তাদের সিএ ফার্ম কর্তৃক নিরীক্ষিত হিসাবে ‘ম্যানেজমেন্ট এক্সপেন্স’ উল্লেখ করা হলেও এটি মূলত আইটি সাপোর্ট সার্ভিস, যা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবার আওতাভুক্ত। এ ক্ষেত্রে এনবিআরের ভ্যাট আইন অনুযায়ী ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট প্রযোজ্য। এ জন্য সে বছরের মে মাসের পাওনার বিপরীতে প্রায় পৌনে সাত কোটি টাকা ভ্যাট পরিশোধ করা হয়েছে। এমনকি যে ভ্যাট কমিশনারেটের মাধ্যমে এই অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে, তাদের পক্ষ থেকেও কোনো আপত্তি জানানো হয়নি। ফলে এনবিআরের দাবিনামা সংশোধন করে নতুন দাবিনামা জারি করার অনুরোধ জানানো হয়।
এ প্রেক্ষাপটে বড় কোম্পানির বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় পড়ে যায় ভ্যাট নিরীক্ষা অধিদফতর। এই সংশয় দূর করতে ভ্যাট নিরীক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক মুহম্মদ জাকির হোসেন ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর এনবিআরের মূসক নিরীক্ষা নীতি বিভাগের কাছে পরামর্শ চেয়ে চিঠি দেন। চিঠিতে জানতে চাওয়া হয়, ট্রান্সকমের ‘ম্যানেজমেন্ট এক্সপেন্স’ খাতের বিপরীতে ভ্যাট ১৫ শতাংশ হবে, নাকি ৫ শতাংশ- সে বিষয়ে নির্দেশনা প্রয়োজন। অনুসন্ধান প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করতেও এনবিআরের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়।
চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘ম্যানেজমেন্ট এক্সপেন্স’ খাতে ১৫ শতাংশের পরিবর্তে ৫ শতাংশ ভ্যাট প্রযোজ্য হলে রাজস্ব দাঁড়াবে ৬২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা; অন্যথায় তা হবে ১২০ কোটি ৩০ লাখ টাকা। পরে ভ্যাট নিরীক্ষা বিভাগের দ্বিতীয় সচিবের পক্ষ থেকে মূসক নীতি বিভাগের কাছে এ বিষয়ে মতামত চেয়ে জরুরি অফিস নোটের মাধ্যমে বোর্ডের নির্দেশনা জানতে চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি চিঠি পাঠানো হয়। এরপর কেটে যায় ছয় মাস। বিষয়টি নিয়ে কালক্ষেপণ করতে থাকে ভ্যাট নীতি উইং। চলতি বছরের ৫ জুলাই এক ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে অন্য কয়েকটি বিষয়ের সাথে এ ঘটনার সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কেও জানতে চাওয়া হয়।
গত ৬ মে দেওয়া এক চিঠিতে মহাপরিচালক জাকির হোসেন জানান, সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কমিশনারেট আপাতত ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায় কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। তবে বোর্ডের আনুষ্ঠানিক মতামত বা নির্দেশনা পাওয়া গেলে তদন্ত প্রতিবেদন পুনর্বিবেচনা করে পার্থক্যজনিত রাজস্ব আদায়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এদিকে ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ নিয়ে ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমানের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে মন্তব্য চাওয়া হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। একইভাবে পরিচালক (করপোরেট ফাইন্যান্স) আব্দুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হলে তিনিও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। অন্যদিকে, এ বিষয়ে জানতে চাইলে মূসক নীতি বিভাগের কর্মকর্তা মো. আজিজুর রহমান বলেন, ট্রান্সকমের ভ্যাট ফাঁকির বিষয়টি তার জানা ছিল না। তবে এমন কিছু ঘটলে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করা হবে।
