প্যারাগন এগ্রোর বিষাক্ত বর্জ্যে অতিষ্ঠ ১০ গ্রামের মানুষ

চার বছর আগে বেশি দামের লোভে স্থানীয়রা তাদের ফসলি জমি প্যারাগন এগ্রোর কাছে বিক্রি করেছিলেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তই এখন তাদের জন্য দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সীমান্তবর্তী শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার কাকরকান্দি ইউনিয়নের মধ্যমকুড়া গ্রামে গড়ে ওঠা প্যারাগন ফিড লিমিটেডের এগ্রো কারখানা থেকে ছড়ানো তীব্র দুর্গন্ধ ও বিষাক্ত বর্জ্যে জনজীবন বিপর্যস্ত। শুধু মধ্যমকুড়া নয়, আশপাশের অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষ এই দূষণের কারণে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

কারখানাটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। চলতি বছর বোরো মৌসুমে শতাধিক একর ফসলি জমির ধান নষ্ট হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বোরোর পাশাপাশি প্রতি বছরই স্থানীয় ফসলি জমির আমন ধানও নষ্ট হয়। বছরে আনুমানিক ২০ থেকে ৬০ লাখ টাকার ধান নষ্ট হয় বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। তবে প্যারাগন বলছে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে কোম্পানির পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে।

সূত্র মতে, ২০২২ সালে স্থানীয়দের কাছ থেকে তুলনামূলক বেশি দামে দুই ফসলি জমি কিনে কার্যক্রম শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। প্রথমে পরিবেশ অধিদপ্তরের শেরপুর কার্যালয় থেকে ৭ একর জমির জন্য অবস্থানগত ছাড়পত্র নিয়ে অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। পরে লেয়ার মুরগির মাধ্যমে ডিম উৎপাদনের অনুমোদন নেয় প্যারাগন। প্রতিদিন ১৪ লাখ ডিম উৎপাদনের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে প্রায় ৭ লাখ ডিম উৎপাদন করছে। পাশাপাশি ফিড ও জৈব সার উৎপাদনের অনুমতিও গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতি ঘণ্টায় ৩ হাজার লিটার বর্জ্য শোধনের সক্ষমতা নিয়ে ইটিপি (বর্জ্য শোধনাগার) স্থাপনের অনুমোদন থাকলেও, ২৮ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই কারখানার জন্য তা যথেষ্ট নয় বলে সংশ্লিষ্টদের মত। বর্তমানে এখানে প্রায় ২১ লাখ মুরগি লালন-পালন করা হচ্ছে, যার ফলে উৎপন্ন বর্জ্য ও বিষ্ঠার তীব্র দুর্গন্ধে আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। এই দুর্গন্ধ ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া কারখানার উত্তর পাশের ফসলি জমির পানির সঙ্গে প্যারাগনের রাসায়নিক ও বিষ্ঠা মিশ্রিত দূষিত পানি যুক্ত হয়ে দক্ষিণ দিকের নিচু জমিগুলোতে প্রবাহিত হচ্ছে, যা কৃষিজমির জন্যও হুমকি তৈরি করছে।

শুধু তাই নয়, কারখানা থেকে নির্গত দূষিত পানি আশপাশের পুকুরে গিয়ে মিশে মাছ মারা যাচ্ছে। এর ফলে মাঠ-ঘাট থেকে দেশীয় প্রজাতির মাছ প্রায় হারিয়ে গেছে এবং ওইসব এলাকায় হাঁস পালনও বন্ধ হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, প্যারাগনের ভারী যানবাহনের চাপ সহ্য করতে না পেরে কাকরকান্দি চৌরাস্তা মোড় থেকে মধ্যমকুড়া পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার পাকা সড়ক নির্মাণের কিছুদিনের মধ্যেই ভেঙে চলাচলের অযোগ্য হয়ে গেছে। সরু রাস্তায় দীর্ঘ সময় ধরে এসব যানবাহন দাঁড়িয়ে থাকায় স্থানীয়দের নিয়মিত যানজটের ভোগান্তিও পোহাতে হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঘাকপাড়া গ্রামের কৃষক রিয়াজ উদ্দিন বলেন, তাদের বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে কারখানাটি হলেও বাতাস এদিকে এলে তীব্র দুর্গন্ধে ঘরে থাকা দায় হয়ে পড়ে। বিন্নিবাড়ি গ্রামের শহর আলী জানান, দুর্গন্ধের কারণে এলাকায় বিয়ের সম্বন্ধও আসতে চায় না। একই গ্রামের খোরশেদ আলম বলেন, পচা গন্ধে স্বাভাবিকভাবে খাওয়াদাওয়াও করা যায় না, আর পরিবেশ এতটাই দূষিত হয়ে গেছে যে চারপাশ মাছিতে ভরে গেছে।

প্যারাগন ফিড এগ্রো লিমিটেডের দেওয়া তথ্য মতে, গেল বোরো মৌসুমে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ১১৪ একর জমির তালিকা প্রণয়ন করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্যারাগন কর্তৃপক্ষ ১৫৩ জন কৃষকের মধ্যে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করে। ক্ষতিপূরণ হিসেবে মোটা ধান একরপ্রতি ৬০ মণ হারে উৎপাদন হিসাব করে প্রতি মণে ৯০০ টাকা এবং চিকন ধান একরপ্রতি ৫০ মণ হারে উৎপাদন হিসাব করে মণপ্রতি ১ হাজার ৪৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আব্দুল মালেকের সভাপতিত্বে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের হাতে ক্ষতিপূরণের টাকা তুলে দেন শেরপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য প্রকৌশলী ফাহিম চৌধুরী।

এখানেই শেষ নয় সামনে আমন মৌসুম ঘিরে ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। শুধু কৃষক নয় দুর্গন্ধে এখনও অতিষ্ঠ স্থানীয় বসবাসরত ভুক্তভোগীরা। প্যারাগনের ভারী যানবাহনের চাপে স্থানীয় সড়কগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি চেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালেখি ছাড়াও স্থানীয়রা একাধিকবার আন্দোলন করেছে। প্যারাগন ফিড লিমিটেড এগ্রোর সহকারী মহাব্যবস্থাপক আনোয়ারুল হক বলেন, ‘প্রতি ঘণ্টায় ১ হাজার লিটার বর্জ্য শোধনক্ষমতার একটি ও ৩ হাজার লিটার বর্জ্য শোধনক্ষমতার আরও একটি মোট দুটি ইটিপিই (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) বর্তমানে সচল রয়েছে। পাশাপাশি আটটি কম্পোস্ট ড্রায়ার বা ফার্মেন্টার স্থাপন করা হয়েছে যেগুলোও কার্যক্রমে রয়েছে। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ১৫৩ জন কৃষককে ইতোমধ্যে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে।’

এ বিষয়ে নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আব্দুল মালেক জানান, কৃষকদের ফসলের ক্ষতির বিষয়টি জানতে কৃষি বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে এবং পরিবেশ দূষণ সংক্রান্ত তথ্যের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে কথা বললে বিস্তারিত জানা যাবে। শেরপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক সুশীল কুমার দাস বলেন, নালিতাবাড়ীতে প্যারাগন ফিড এগ্রো লিমিটেডের কারণে দূষিত হওয়া এলাকাগুলো সরেজমিনে তদন্ত করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের ঢাকা কার্যালয়ের মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট শাখায় পাঠানো হয়েছে। সেখানে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়েছে এবং একজন বিচারক শুনানির মাধ্যমে অভিযোগের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন।