চার মানদণ্ড পূরণ হলেই প্রকল্প অনুমোদন: অর্থমন্ত্রী

বর্তমানে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রায় ১ হাজার ৩০০টি প্রকল্প রয়েছে। তবে এসব প্রকল্পের কিছুতে অর্থের সঠিক ব্যবহার, বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত আয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত বিষয় যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে যেসব প্রকল্প এই চারটি মানদণ্ড পূরণ করতে পারবে, সেগুলোকেই অনুমোদন দেওয়া হবে। তিনি বলেন, সরকারের অর্থ মূলত জনগণের, অর্থাৎ করদাতাদের টাকা। তাই প্রতিটি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি প্রকল্প গ্রহণের পেছনে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও প্রত্যাশিত সুফল থাকতে হবে এবং সে বিষয়ে জনগণকেও অবহিত করতে হবে।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে রোববার (১০ মে) পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) মিলনায়তনে ‘স্টেপিং ফরওয়ার্ড: দ্য ইনাগুরেশন অব রেইজ-২’ শীর্ষক উদ্বোধনী সভা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক। এ ছাড়া সম্মানিত অতিথি ছিলেন দ্য ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের আঞ্চলিক পরিচালক গেইল এইচ মার্টিন। অনুষ্ঠানে সভাপতি হিসেবে বক্তব্যে দেন পিকেএসএফের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের।

সাধারণ মানুষ অর্থনীতির বাইরে থেকে গেছে

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অতীতে অলিগার্কি ও পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক অর্থনীতির কারণে অর্থনৈতিক কার্যক্রম কিছু গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, ফলে সাধারণ মানুষ এর বাইরে থেকে গেছে। এর প্রভাব হিসেবে দারিদ্র্য বেড়েছে এবং এখনো সেই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। তিনি জানান, সরকার বড় মেগা প্রকল্পের পরিবর্তে ফ্যামিলি কার্ডের মতো সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচির ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সরকার ধীরে ধীরে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার দিকে এগোচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে নিজস্ব পকেট থেকে ব্যয় আফগানিস্তানের তুলনায়ও বেশি, যা উদ্বেগজনক। তাই প্রাথমিক ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে সবার জন্য নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যার প্রতিফলন আগামী বাজেটে দেখা যাবে।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আরও বলেন, ‘আমাদের ধারণা, জিডিপি মানেই শুধু উৎপাদন। তবে সংস্কৃতি, সংগীত ও খেলার মতো বিষয় ক্রিয়েটিভ ইকোনমি হিসেবে জিডিপিতে অবদান রাখতে পারে। লন্ডনের থিয়েটার ডিস্ট্রিক্টে যে ধরনের অর্থনৈতিক কার্যক্রম দেখা যায়, তা অনেক কারখানার চেয়েও বড়। স্টেডিয়ামে মানুষ টিকিট কেটে খেলা দেখতে যায়, সেটাও অর্থনীতি। হাজার হাজার মানুষ সেখানে গিয়ে খেলা দেখে, খরচ করে, এটাও জিডিপিতে অবদান রাখে। তাই এই জায়গাগুলোতে আমাদের বেশি মনোযোগ দেওয়া দরকার।’

রেইজ ২ প্রকল্পে যা আছে

অনুষ্ঠানের শুরুতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের জানান, প্রকল্পটির প্রধান তিনটি লক্ষ্য হলো শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ঝুঁকি হ্রাস। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে ১৩টি কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে ১৫ হাজার লার্নিং সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ছয় মাসের প্রশিক্ষণ শেষে প্রায় ৭৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারী সংশ্লিষ্ট খাতে কর্মসংস্থানে যুক্ত হচ্ছেন। তিনি আরও জানান, প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে দুই লাখ তরুণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এছাড়া ১ হাজার ৬০০ নারীকে গৃহভিত্তিক শিশু লালন-পালনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। বিশ্বব্যাংক ও পিকেএসএফের যৌথ অর্থায়নে প্রথম পর্যায়ে প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার তরুণকে প্রশিক্ষণ ও ঋণসহায়তা দেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো অনানুষ্ঠানিক খাতের উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি। দ্বিতীয় পর্যায়ে চর, হাওর, পার্বত্য ও উপকূলীয় জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের তরুণদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক খাতে

অনুষ্ঠানে পিকেএসএফের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান বলেন, দেশে মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে সৃষ্টি হয় এবং জিডিপিতে এই খাতের অবদান ৩০ শতাংশেরও বেশি। তিনি বলেন, অনেকের ধারণা এই খাতের কর্মীরা অদক্ষ, তবে বাস্তবে কেউ আংশিক দক্ষ, কেউ আবার একেবারেই প্রশিক্ষণবিহীন। এই প্রকল্পের মাধ্যমে কম দক্ষদের দক্ষ করে তোলা এবং যারা কিছুই জানেন না, তাদেরও প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হচ্ছে। অন্যদিকে, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের আঞ্চলিক পরিচালক গেইল এইচ মার্টিন বলেন, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি। দারিদ্র্য থেকে উত্তরণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো কর্মসংস্থান। তিনি জানান, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ কর্মসংস্থানের চাহিদা থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে প্রায় ৯ লাখ। তাই কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।