গ্রাহকের অজান্তে নেওয়া হয়েছে কোটি টাকা ঋণ

চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলায় একটি বেসরকারি ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং শাখার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের তথ্য জালিয়াতি করে প্রতারণামূলক ঋণ বিতরণ, অর্থ আত্মসাৎ ও আইনি হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় দায় চাপানো হচ্ছে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের ওপর, যা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। এ অবস্থার প্রতিকার ও জড়িতদের শাস্তির দাবিতে শনিবার (১৭ এপ্রিল) দুপুরে চাঁদপুর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন ভুক্তভোগীরা।

সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা জানান, হাইমচর উপজেলার দক্ষিণ আলগী ইউনিয়নের চরভাঙ্গা গ্রামের তাজুল ইসলাম কবিরাজ, তাঁর স্বজন আছমা আক্তার ও ভাই মো. আলাউদ্দিন কবিরাজের নিয়ন্ত্রণাধীন ইসলামী ব্যাংকের একটি এজেন্ট ব্যাংকিং শাখার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। শাখার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা স্থানীয় প্রায় অর্ধশত ব্যক্তির কাছ থেকে ডিপিএস হিসাব খোলার কথা বলে জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, টিপসই ও স্বাক্ষর সংগ্রহ করেন। এরপর ইসলামী ব্যাংকের চাঁদপুর ও ফরিদগঞ্জ শাখা থেকে এসব গ্রাহকের নামে নেওয়া হয় আনুমানিক দুই কোটি টাকা।

নূর–ই–আলম নামে এক ভুক্তভোগী অভিযোগ করে বলেন, ইসলামী ব্যাংকের চাঁদপুর শাখার সাবেক কর্মকর্তা তাজুল ইসলাম তাঁর শ্যালিকা আসমা আক্তারের নামে হাইমচরে একটি এজেন্ট ব্যাংকিং শাখা চালু করেন। ওই শাখা মূলত পরিচালনা করতেন তাজুল ইসলাম ও তাঁর ভাই আলাউদ্দিন কবিরাজ। তাদের সঙ্গে নেপথ্যে আরও কয়েকজন ব্যাংক কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ইসলামী ব্যাংকের চাঁদপুর শাখার সাবেক ফিল্ড অফিসার তাজুল ইসলাম কবিরাজ বলেন, তিনি গত জানুয়ারিতে স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়েছেন। তাঁর দাবি, গ্রাহকদের যে সময়ে ঋণ দেওয়া হয়েছে, তখন তিনি ফরিদগঞ্জ শাখায় কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত নন। ঋণের অর্থ যারা নিয়েছেন, সে বিষয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষই জবাব দেবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

হাইমচর ইউনিয়নের সাহেবগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা কাদের সরদার পেশায় ট্রলারচালক। তিনি বলেন, ‘তিন মাস আগে জানতে পারি আমার নামে ব্যাংক লোন রয়েছে। এ কাজে আমার অগোচরে ডিপিএসের নাম করে এনআইডি কার্ড ব্যবহার করা হলেও আমি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নই। এলাকার বাসিন্দা ও চাঁদপুর ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা তাজুল ইসলাম কবিরাজ আমাকে ফাঁসিয়েছে। সে আমার নামে ব্যাংকে ভুয়া কাগজ তৈরি করে তিন লাখ টাকা লোন নেয়, যা বর্তমানে সুদে–আসলে ৩ লাখ ৪১ হাজার ৬০০ টাকা হয়েছে। এ ঘটনায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দায়ের করা মামলায় আমি এখন পলাতক আসামি।’ একই ধরনের অভিযোগ করেন শাহজালাল সরকার, সোহেল রানা, আমানউল্লাহ সর্দার, বারেক সর্দার ও শাহজালাল সর্দার নামে স্থানীয় আরও কয়েকজন। তাঁরা হাইমচর উপজেলার নীলকমল ইউনিয়নের মধ্যচর এলাকার বাসিন্দা।

শাহজালাল সরকার জানান, ডিপিএসের নাম করে তাঁর কাছ থেকে এনআইডি কার্ডের ফটোকপি নেওয়া হয়। তাঁর নামে নেওয়া লোন এখন সুদে–আসলে ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি নিরীহ লোক। কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করি। আমি এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’ ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের অভিযোগ, তাঁদের তথ্য ব্যবহার করে অজ্ঞাতে একাধিক ব্যাংক হিসাব খোলা হয়, চেকবই ইস্যু করা হয় এবং পরে তাঁদের নামে ঋণ অনুমোদন করা হয়। কিন্তু ওই ঋণের অর্থ গ্রাহকদের হাতে না দিয়ে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আত্মসাৎ করেছেন। পুরো প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছিল বলেও দাবি ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের।

ঋণ পরিশোধ না হওয়ায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেছে। মামলার বিষয়ে কোনো নোটিশ না দিয়েই অনেকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে, কয়েকজনকে ইতিমধ্যে কারাভোগ করতে হয়েছে। পরে তাঁরা বাধ্য হয়ে ঋণের আংশিক অর্থ আদালতে জমা দিয়ে জামিনে মুক্তি পান। অথচ আসামিদের কেউই ঋণ গ্রহণের বিষয়ে অবগত ছিলেন না বলে দাবি করেন।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, মামলার পুরো প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগীদের অজ্ঞাতে ভুয়া তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে এবং আদালতেও বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হয়েছে, যার ফলে বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চেক–সংক্রান্ত মামলার ক্ষেত্রে আইনি নোটিশ প্রদান বাধ্যতামূলক হলেও ভুক্তভোগীরা কেউই এমন কোনো নোটিশ পাননি বলে অভিযোগ করেন। এছাড়া ঋণের অর্থ গ্রহণ না করায় তাদের বিরুদ্ধে দায় আরোপ আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয় বলেও তারা দাবি করেন। ভুক্তভোগীরা আরও জানান, একই কৌশলে ব্যাংকের অন্য শাখাতেও অনুরূপ প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে, ফলে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক ও অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে তারা একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন, জড়িতদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ ফেরত ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এজেন্ট ব্যাংকিং শাখার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বানও জানান তারা।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হামিদুল মিসবাহ বলেন, নিরীহ গ্রাহকদের তথ্য ব্যবহার করে এ ধরনের প্রতারণা শুধু আর্থিক অপরাধ নয়, এটি মানুষের জীবনে মারাত্মক দুর্ভোগ ডেকে এনেছে। অনেকেই বিনা অপরাধে কারাভোগ করেছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মামলার বাদী ইসলামী ব্যাংকের প্রতিনিধি মো. আশরাফুজ্জামান ও ইসলামী ব্যাংকের চাঁদপুর শাখার ব্যবস্থাপক সাখাওয়াত হোসেনের একাধিক মুঠোফোন নম্বরে কল করা হলে সংযোগ বন্ধ পাওয়া যায়।