দেশের আর্থিক খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে ‘হোয়াইট লেবেল এজেন্ট নেটওয়ার্ক (WLAN)’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরীক্ষামূলকভাবে এই সেবা দেবে পে-স্টেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটি দেশের মোবাইল আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপনে কাজ করবে। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকগুলোর মধ্যেও সংযোগ তৈরির দায়িত্ব পাবে জয়তুন ফাউন্ডেশন নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান। এজেন্ট নিয়োগ সংক্রান্ত একটি খসড়া নীতিমালা ইতোমধ্যে প্রণয়ন করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
নতুন এই ব্যবস্থায় একটি একক এজেন্টের মাধ্যমেই ব্যাংক, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি) এবং মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানগুলোর (এমএফআই) গ্রাহকরা লেনদেন করতে পারবেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট-১ সম্প্রতি এ সংক্রান্ত খসড়া নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে পেমেন্ট সিস্টেম অ্যাক্ট ২০২৪ অনুযায়ী লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটর (পিএসও) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জয়তুন বিজনেস সলিউশনের চেয়ারম্যান আরফান আলী বলেন, বর্তমানে একেকজন এজেন্টের কাছে গিয়ে এক এক ধরনের আর্থিক সেবা নিতে হয়। হোয়াইট লেভেল এজেন্ট নিয়োগের পর এক এজেন্টের কাছেই সব ধরনের সেবা পাওয়া যাবে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতি গ্রোথ খুব দ্রুতই বাড়বে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্যাশলেস বাংলাদেশ গঠনের যে লক্ষ্যমাত্রা আছে সেটিও পূরণ হবে। আর এক এজেন্টের কাছে সব ধরনের সেবা থাকায় এজেন্টদেরও আগের থেকে লেনদেন ও ব্যবসা বাড়বে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে ৪২ কোটির বেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও মোবাইল ওয়ালেট রয়েছে। তবে জমা, উত্তোলন ও অর্থ স্থানান্তরের সীমিত সুযোগের কারণে এর একটি বড় অংশ এখনও সক্রিয়ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। বর্তমানে প্রতিটি ব্যাংক ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান আলাদা আলাদা এজেন্ট নেটওয়ার্ক পরিচালনা করায় গ্রাহকদের নির্দিষ্ট সেবার জন্য ভিন্ন ভিন্ন এজেন্টের ওপর নির্ভর করতে হয়। প্রস্তাবিত ‘হোয়াইট লেবেল এজেন্ট নেটওয়ার্ক (WLAN)’ চালু হলে এই সীমাবদ্ধতা দূর হবে এবং একটি এজেন্টের মাধ্যমেই সব প্রতিষ্ঠানের সেবা পাওয়া সম্ভব হবে। এতে সেবার পরিধি বাড়ার পাশাপাশি গ্রাহকদের ভোগান্তিও কমবে।
খসড়া নির্দেশিকা অনুযায়ী, হোয়াইট লেবেল এজেন্টরা নগদ টাকা জমা ও উত্তোলন, অ্যাকাউন্ট ও ওয়ালেটের মধ্যে অর্থ স্থানান্তর, বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ বিভিন্ন বিল পরিশোধ, ব্যক্তি থেকে সরকারের (পি টু জি) পেমেন্ট এবং গ্রাহক নিবন্ধনে সহায়তাসহ বিভিন্ন সেবা দিতে পারবে। বাংলাদেশ ব্যাংক এই এজেন্টদের ‘হিউম্যান এটিএম’ হিসেবে গড়ে তুলতে চায়, যাতে গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকাতেও সহজে নগদ লেনদেন করা যায়, যেখানে প্রচলিত এটিএম সুবিধা সীমিত।
অর্থনীতিবিদ ও সাবেক ব্যাংকার মামুন রশিদ বলেন, কেনিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের সেবা আছে। এটি ক্যাশলেস লেনদেন বাস্তবায়নে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে আমাদের এখানে গ্রাহক পর্যায়ে আর্থিক জ্ঞান খুবই কম। এ জন্য যারা এই কার্যক্রমে যুক্ত হবে ঐসব কোম্পানি যদি কাস্টমার এডুকেশনের বিষয়টাও দেখে তাহলে খুবই ভালো হয়। সব মিলিয়ে এই বিষয়টির সাথে আমরা খুব দ্রুতই খাপ খাইয়ে নিতে পারব বলে মনে করছি।
এই নেটওয়ার্ক পরিচালনার জন্য টেলিকম কোম্পানি, বড় খুচরা ও বিতরণ নেটওয়ার্ক, ব্যাংক, এমএফএস, এমএফআই, পিএসপি এবং অন্যান্য সক্ষম প্রতিষ্ঠান আবেদন করতে পারবে। লাইসেন্স প্রদান করা হবে তিন ধাপে— আবেদন, মূল্যায়ন ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম (পাইলট), এবং চূড়ান্ত অনুমোদন। এক্ষেত্রে আবেদন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ হাজার টাকা এবং লাইসেন্স ফি ৫ লাখ টাকা।
প্রযুক্তিগতভাবে এজেন্টরা বাংলা কিউআর কোড, মাইক্রো এটিএম, ডেবিট কার্ড এবং এনএফসি প্রযুক্তির মাধ্যমে লেনদেন সম্পন্ন করতে পারবে। প্রতিটি লেনদেনে দুই স্তরের নিরাপত্তা যাচাই—যেমন ওটিপি, পিন বা বায়োমেট্রিক পদ্ধতি—বাধ্যতামূলক থাকবে এবং লেনদেন শেষে গ্রাহককে তাৎক্ষণিকভাবে এসএমএস বা রসিদের মাধ্যমে নিশ্চিতকরণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি এসব সিস্টেমকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষা নীতিমালা মেনে চলতে হবে। গ্রাহক সুরক্ষায় নির্দেশিকায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যেখানে এজেন্টদের গ্রাহকের পরিচয় যাচাই, নির্ধারিত ফি তালিকা প্রকাশ এবং অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া ২৪ ঘণ্টা কাস্টমার সাপোর্ট চালুর নির্দেশনা রয়েছে এবং কোনো এজেন্ট গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ করতে পারবে না। সব ধরনের লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি ও রিপোর্টিং ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক এই নেটওয়ার্কের কার্যক্রম নিয়মিত অডিট, পরিদর্শন ও রিপোর্টের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করবে। কোনো ধরনের অনিয়ম, জালিয়াতি বা নীতিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করা হতে পারে। একই সাথে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
