দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নয়ন এবং শিল্পে গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে সময়মতো এলএনজি কার্গো আমদানি নিশ্চিত করতে সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়া এড়িয়ে চলার নির্দেশনাও দিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া ২০২৯ সালের মধ্যে দেশকে বড় পরিসরের ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে গড়ে তুলতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা আরও উন্নত করার পাশাপাশি পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
জ্বালানি সংকট পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার অবস্থার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়নে ২০২৯ সাল পর্যন্ত মধ্যমেয়াদি ও ২০৩৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তুলে ধরে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এ সময় গ্যাস, জ্বালানি তেল, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলসহ বিভিন্ন জ্বালানির চাহিদা ও সরবরাহ পরিস্থিতি, বিদ্যুতের চাহিদা এবং কোন জ্বালানি থেকে কত পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, তার বিস্তারিত পর্যালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, আগামী শীতকালের মধ্যে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং আগামী গ্রীষ্মকালের মধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে। ২০২৯ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে দেশের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি কীভাবে বিকশিত হবে, সে বিষয়ে একটি বিস্তারিত রূপরেখা চেয়েছেন তারেক রহমান। বিনিয়োগকারীদের জ্বালানি প্রাপ্তির বিষয়ে একটি স্পষ্ট ও আগাম ধারণা দিতেই সরকার এই সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি করতে চায়।
৫৭ দিনের জ্বালানি তেল মজুদের প্রত্যাশা
সরকার জ্বালানি তেলের ৯০ দিনের মজুদ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী ৩০ আগস্ট পর্যন্ত যেসব জ্বালানি তেল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে, সেগুলোর চালান সময়মতো দেশে পৌঁছালে ৫৭ দিনের মজুদ নিশ্চিত হবে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশে জ্বালানি তেলের মজুদ ছিল ১৪ দিনের। তবে স্বল্পমেয়াদে গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সরকারের হাতে বড় ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ নেই। তাই বিদ্যমান দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) সক্ষমতা অনুযায়ী এলএনজি আমদানি নিশ্চিত করতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি (ডিপিএম) এড়িয়ে চলার ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সম্প্রতি ডিপিএম পদ্ধতিতে ক্রয়াদেশ দেওয়া ছয়টি এলএনজি কার্গো বাংলাদেশে সরবরাহ করা হয়নি। বরং বিদেশি কোম্পানিগুলো বেশি দামে কার্গোগুলো অন্য দেশে সরবরাহ করেছে। এ বিষয়ে একজন কর্মকর্তা জানান, প্রধানমন্ত্রী সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে এলএনজি কেনাকে নিরুৎসাহিত করেছেন। এলএনজি কেনার ক্ষেত্রে যথাসম্ভব ডিপিএম পদ্ধতি এড়িয়ে চলার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। কারণ এতে এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি দুর্নীতির সুযোগও তৈরি হয়।
শিল্পে গ্যাস দিতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতে জোর
স্বল্পমেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এতে বিদ্যুতে ভর্তুকির পরিমাণ কিছুটা বাড়িয়ে হলেও— শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে এ নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। জ্বালানি বিভাগ প্রধানমন্ত্রীকে আরও জানিয়েছে যে, আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট চালুর মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হলে— গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর চাপ কিছুটা কমবে এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে।
ভোলার গ্যাস পাইপলাইন পরিকল্পনা
২০২৯ সালের মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নয়নে ভোলায় আবিষ্কৃত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে পাইপলাইন স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে এ বিষয়ে একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়েছে। পাইপলাইন স্থাপনে ব্যয় হবে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি দামে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে, যার প্রতিটি কার্গোতে খরচ হচ্ছে ৭৩০ থেকে ৭৫০ কোটি টাকা। ফলে ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হলেও তা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে। পাশাপাশি দেশের ১৫০টি গ্যাসকূপ খনন ও পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে অতিরিক্ত ১ হাজার ৭৫০ এমএমসিএফটি গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেছে জ্বালানি বিভাগ। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে কার্যক্রম আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তির সন্ধান
এলএনজির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকতে চায় না সরকার। তাই এ অঞ্চলের বাইরে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চলছে। আমেরিকার আরও দু’একটি কোম্পানির সঙ্গেও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চলছে। প্রধানমন্ত্রীকে জ্বালানি বিভাগ বলেছেন, সারাদেশে ৫,২০০ এমএমসিএফডি গ্যাসের লোড অনুমোদন দেওয়া আছে। এরমধ্যে ৩,২০০ এমএমসিএফডি গ্যাস নিয়মিত সরবরাহ করা সম্ভব হলে, সব খাত মোটামুটি স্বাভাবিকভাবে চলতে পারবে। আর ৩,৮০০ এমএমসিএফডি সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে গ্যাসের কোনো ঘাটতি হবে না।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে ২,৬০০-২,৭৫০ এমএমসিএফটি গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। এরমধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনেই ১,৫৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস দিতে হয়, যা মোট গ্যাস সরবরাহের ৬২ শতাংশ। বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য ১,০০০ এমএমসিএফডি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্যাপটিভ পাওয়ার উৎপাদনের জন্য ৫৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করতে হয়। বাকি ৩৮ শতাংশ গ্যাস শিল্প কারখানা, বাণিজ্যিক কার্যক্রম, পরিবহন ও বাসাবাড়িতে সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
২০১৮ সাল থেকেই কমছে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন
শিল্প গ্রাহকদের গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ খাতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর সুপারিশ করেছে জ্বালানি বিভাগ। যদিও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন খরচ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় কিছুটা বেশি। এরপরও শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস নিশ্চিত করার স্বার্থে কয়লায় সামান্য বাড়তি খরচ করার পক্ষে মত দিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। এক এমএমসিএফডি গ্যাস দিয়ে ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোরও পরামর্শ দিয়েছে বিভাগটি।
বাংলাদেশ ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু করে। এর আগে দেশে উত্তোলিত গ্যাস দিয়েই অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো সম্ভব ছিল। ২০১৮ সালে দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক ২ হাজার থেকে ২ হাজার ১০০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা যেত। পরবর্তী সময়ে দেশে গ্যাসের চাহিদা বাড়তে থাকায় সরকার এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়। একই সময়ে দেশীয় গ্যাসকূপ থেকে উৎপাদন বাড়েনি, বরং কমেছে। বর্তমানে দেশের গ্যাসকূপগুলো থেকে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৬০০ এমএমসিএফডি গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস ঘাটতি মোকাবিলায় ২০২৯ সালের মধ্যে আরও তিনটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনের পরিকল্পনা করছে সরকার।
