দেশে বর্তমানে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার মতো কোনো পরিস্থিতি নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার (১৬ জুন) বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। সংবাদপত্রের কালো দিবসের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একসময় এই দিনে দেশে মাত্র চারটি সংবাদপত্র রেখে বাকিগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রও বিলুপ্ত করা হয়। একই সময়ে সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে ‘বাকশাল’ গঠন করা হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, আজ সেই একই দিনে সাংবাদিকদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা হচ্ছে, যা প্রমাণ করে যে অতীতের মতো গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের পরিস্থিতি এখন আর নেই।
প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেছিলেন এবং সংবাদপত্রের ওপর থেকে সমস্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছিলেন বলেও এ সময় উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। মতবিনিময় সভায় রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের ‘প্রতিশোধের মানসিকতা’ থেকে সবাইকে বেরিয়ে এসে দেশের উন্নয়নে ইতিবাচক কাজ করার আহ্বান জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের নিজেদের চিন্তা কিছুটা পরিবর্তন করার চেষ্টা করি। আমার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে, কিন্তু আপনি এখন প্রতিশোধ নিলেই কি আপনার সেই ক্ষতিপূরণ হবে বা সবকিছু আগের মতো হয়ে যাবে, না। তাহলে আমরা সেই প্রতিশোধের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে ভাবি যে, আমরা দেশের জন্য, সমাজের জন্য বা মানুষের জন্য কী করতে পারি। সফল হওয়া বা না হওয়া পরের ব্যাপার, অন্তত এই মানসিকতা নিয়ে কেন আমরা সামনের দিনে এগিয়ে যাব না?’
দেশের যুবসমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে দেশব্যাপী খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতার ওপর বিশেষ জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, শুধু চিকিৎসা বা কাউন্সেলিং দিয়ে এই সংকট দূর করা সম্ভব নয়, কারণ, রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের মানসিক ও শারীরিক শক্তিকে ইতিবাচক খাতে ব্যবহার করতে হবে। তরুণদের জন্য সরকার ইতিমধ্যে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা চালু করেছে, যেখানে দেশের প্রায় ২২ লাখ ছেলে-মেয়ে অংশ নিয়েছে বলেও এ সময় উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
নির্দিষ্ট কিছু জাতীয় দিবস—যেমন ১৬ ডিসেম্বর বা ২১ ফেব্রুয়ারি—ছাড়া কেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সারা বছর সাংস্কৃতিক ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয় না, সে প্রশ্ন তুলে প্রধানমন্ত্রী এসব কার্যক্রম নিয়মিত চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে মেধা বিকাশে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে উদ্ভাবনী মেলা (সায়েন্স ফেয়ার) আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন এবং এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে আরও বেশি প্রচারের আহ্বান জানান। সাম্প্রতিক সময়ে সমাজে ছড়িয়ে পড়া কিছু নিষ্ঠুর আচরণের সমালোচনা করে তিনি বলেন, জীবন্ত প্রাণীকে পিটিয়ে হত্যা করা এবং তা মোবাইলে ধারণ করার প্রবণতা অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও উদ্বেগজনক। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্কুল পর্যায় থেকেই সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়কে সচেতনতামূলক প্রচারাভিযান চালানোর নির্দেশ দেন তিনি। এ ছাড়া সভায় দেশের অর্থনৈতিক সংস্কার, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করা এবং সরকারের প্রস্তাবিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়েও সাংবাদিকদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
গম্ভীর আলোচনার পাশাপাশি মতবিনিময় সভায় উঠে আসে চলতি ফুটবল বিশ্বকাপের প্রসঙ্গও। পুরো দেশ যখন ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনায় বিভক্ত, তখন এক সাংবাদিক প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান—তিনি কোন দলকে সমর্থন করেন। সরাসরি কোনো দলের নাম না নিয়ে মৃদু হেসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জবাব দেন, ‘আমি দীর্ঘদিন একটি দেশে (ইংল্যান্ড) ছিলাম, বুঝতেই পারছেন। আপনি আপনার উত্তর পেয়েছেন তো?’ প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনির সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, স্পিচ রাইটার এস এ এম মাহফুজুর রহমান, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, উপপ্রেস সচিব হাসান শিপলু, সুজাউদ্দৌলা সুজন ও শাহাদাত হোসেন স্বাধীনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সিনিয়র সাংবাদিকেরা।
