শেয়ারবাজারের বিভিন্ন আইন ও বিধি-বিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে তালিকাভুক্ত কোম্পানি খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেডের চেয়ারম্যান, পরিচালক ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সংস্থাটি কোম্পানিটির ছয়জন দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে মোট ২৪ লাখ টাকা জরিমানা করেছে। বিএসইসির এনফোর্সমেন্ট বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন কোম্পানির চেয়ারম্যান এস এম আমজাদ হোসেন, পরিচালক মো. আমজাদ হোসেন ও খান হাবিবুর রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুফিয়া খাতুন, সিএফও মো. এজাজ উদ্দিন এবং কোম্পানি সচিব মিলন খান।
তথ্যমতে, দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তদন্তে কোম্পানিটি দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক অনিয়ম, তথ্য গোপন এবং নিয়মিত প্রতিবেদন দাখিলে ব্যর্থতার মতো গুরুতর অনিয়ম পাওয়া গেছে। এ ছাড়া টানা তিন বছর লোকসান, লভ্যাংশ না দেওয়া এবং উৎপাদন বন্ধ থাকার তথ্য গোপন করাসহ একাধিক বিষয়ে গুরুতর অসংগতি পাওয়া যায়। শেয়ারবাজারের স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় বিএসইসি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তদন্ত কমিটি জানায়, কোম্পানিটি গত টানা তিন বছর ধরে লোকসানে রয়েছে। এ কারণে এটি বিএসইসির নির্ধারিত ‘এক্সিট প্ল্যান’-এর আওতায় পড়ার মতো পরিস্থিতিতে রয়েছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কোম্পানির রিটেইনড আর্নিংস (সঞ্চিত আয়) ঋণাত্মক হয়ে দাঁড়িয়েছে ৯৯.৪৬ কোটি টাকা, যা কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের (৭৩.০৪ কোটি টাকা) চেয়েও বেশি। এটি কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।
কোম্পানিটির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ
কোম্পানিটি টানা তিন বছর কোনো নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি, যা বিনিয়োগকারীদের স্বার্থবিরোধী এবং এক্সিট প্ল্যানের একটি শর্ত পূরণ করে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত এ প্রতিষ্ঠানটি তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে বার্ষিক লিস্টিং ফি পরিশোধ করেনি। ২০২৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বকেয়ার পরিমাণ সারচার্জসহ প্রায় ১২.৯৩ লাখ টাকা, যা কোম্পানিটিকে ডি-লিস্টিংয়ের ঝুঁকিতে ফেলেছে। এছাড়া ২০২২ সালের জুনের পর থেকে কোম্পানিটি কোনো ত্রৈমাসিক বা বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেয়নি, ফলে বিনিয়োগকারীরা এর প্রকৃত আর্থিক অবস্থার বিষয়ে অন্ধকারে রয়েছেন। একই বছরের অক্টোবর থেকে মাসিক শেয়ারহোল্ডিং পজিশন ও ফ্রি-ফ্লোট রিপোর্টও বন্ধ রয়েছে, যা বাজারে স্বচ্ছতা ও তথ্যপ্রবাহে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে।
সবচেয়ে গুরুতর অনিয়মগুলোর একটি হলো— কোম্পানির উৎপাদন কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকলেও এ তথ্যটি ‘প্রাইস সেনসিটিভ ইনফরমেশন’ (পিএসআই) হিসেবে প্রকাশ করা হয়নি। এটি সরাসরি বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করার শামিল এবং ইনসাইডার ট্রেডিং বিধিমালার লঙ্ঘন। কোম্পানির প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) এবং কোম্পানি সচিব পদ যথাক্রমে ২০২২ সালের নভেম্বর ও অক্টোবর থেকে শূন্য রয়েছে। করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড অনুযায়ী, এই পদগুলো শূন্য রাখা গুরুতর অনিয়ম। কোম্পানির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটও সচল পাওয়া যায়নি, যা তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য বাধ্যতামূলক তথ্যপ্রকাশ ব্যবস্থার লঙ্ঘন।
অভিযুক্তদের কার কত জরিমানা
এই সব অনিয়মের জন্য খুলনা প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেডের চেয়ারম্যান এস এম আমজাদ হোসেন, পরিচালক মো. আমজাদ হোসেন, খান হাবিবুর রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুফিয়া খাতুন, সিএফও মো. এজাজ উদ্দিন এবং কোম্পানি সচিব মিলন খানকে পৃথকভাবে বিভিন্ন ধারায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি লঙ্ঘনের জন্য প্রত্যেকের ওপর এক লাখ টাকা করে জরিমানা আরোপ করা হয়। চারটি পৃথক ধারায় এ জরিমানা কার্যকর হওয়ায় ছয়জনের মোট জরিমানার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪ লাখ টাকা। এ অর্থ ৩০ দিনের মধ্যে পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
