কর্মক্ষম মানুষের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন

দেশে এখন কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ও অনুপাত বাড়ছে। কিন্তু এই জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত ২০৪৫ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। অর্থাৎ জনসংখ্যাগত সুবিধা কাজে লাগানোর জন্য হাতে রয়েছে প্রায় দুই দশক। এরপর কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত কমতে শুরু করবে। ২০৫১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ প্রবীণ জনসংখ্যাপ্রধান দেশে পরিণত হবে। এ অবস্থায় এখনই কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাজধানীর একটি হোটেলে ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেইলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের প্রভাব, কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যতে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রায় ৮৪ শতাংশ কর্মী, সংখ্যায় প্রায় পাঁচ কোটি ৮০ লাখ, অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জন করেও অনেককে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। দেশটির প্রায় ৪৪ শতাংশ স্নাতক অনানুষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত। আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গতি ধীর। অন্যদিকে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো সাম্প্রতিক সময়ে গড়ে কর্মী কমিয়েছে।

বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত সম্ভাবনা নির্ভর করছে এখন দেশটি কী পদক্ষেপ নেয় তার ওপর। প্রতিষ্ঠানগুলোকে উন্নত কর্মসংস্থান তৈরিতে সহায়তা, তরুণদের বাজারের চাহিদাভিত্তিক দক্ষতায় দক্ষ করে তোলা এবং নারীদের কর্মসংস্থানের পথে বাধা দূর করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও বার্ধক্যকালীন আর্থিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। এ জন্য অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোও প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে বলা হয়েছে, ২০০০ সাল থেকে কর্মক্ষম বয়সের মানুষের অনুপাত বাড়ায় এ অঞ্চলের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বছরে অতিরিক্ত ০ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে শ্রম উৎপাদনশীলতা বেড়েছে বছরে ১.১ শতাংশ। কিন্তু জনসংখ্যাগত সুবিধা থেকে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে যে অবদান আসছে, তা ক্রমেই কমবে। ২০২৪ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে এ অবদান বছরে ০ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ০ দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসবে।

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জাট বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো তুলনামূলকভাবে কম মাথাপিছু আয়েই দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগোচ্ছে। তাই এখনই উন্নত ও বেশি কর্মসংস্থান তৈরির নীতি গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যবান প্রবীণদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রাখার সুযোগ তৈরি করতে হবে। এতে জনসংখ্যাগত সুবিধার পাশাপাশি ভবিষ্যতে দ্বিতীয় দফা অর্থনৈতিক সুফল পাওয়ার ভিত্তি তৈরি হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১১৭ কোটি। তবে এ অঞ্চলের কর্মক্ষম জনসংখ্যা এক দশকেরও কম সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে কমতে শুরু করবে। ২০৪৯ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া প্রবীণ জনসংখ্যাপ্রধান অঞ্চলে পরিণত হবে। তখন মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশের বয়স হবে ৬৫ বছর বা তার বেশি। বাংলাদেশে এ পরিবর্তন ঘটবে ২০৫১ সালে। প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ও পেনশন ব্যবস্থাও দক্ষিণ এশিয়ায় যথেষ্ট প্রস্তুত নয়। অঞ্চলের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মাত্র ১৭ শতাংশ পেনশন ব্যবস্থায় অবদান রাখেন। আর প্রবীণদের মাত্র ১০ শতাংশ কোনো না কোনো পেনশন সুবিধা পান। বিশ্বে পেনশন সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে এটিই সর্বনিম্ন হার।

জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দুটি ক্ষেত্রে একযোগে পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রথমত, তরুণ জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনা কাজে লাগাতে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বাড়ানো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ, ব্যবসায়িক বিধিবিধান সহজ করা এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দক্ষতার উন্নয়ন করতে হবে। পাশাপাশি নারীদের কর্মসংস্থানের বাধা দূর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ও পেনশন ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বাড়িয়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। বিশ্বব্যাংকের মতে, জনসংখ্যাগত সুবিধার সময় শেষ হওয়ার আগেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া না গেলে ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।