বেসরকারি খাতের ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে ঋণের নামে ১৮ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আলোচিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে ওঠা এ অভিযোগকে দেশের ব্যাংকিং খাতের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ভুয়া নথিপত্র ও নিয়মবহির্ভূত ঋণ অনুমোদনের অভিযোগে ব্যাংকটির সাবেক ১৪৮ কর্মকর্তার সংশ্লিষ্ট নথি তলব করেছে দুদক।
দুদক সূত্র জানায়, অনুসন্ধানে ব্যাংকটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবিএম মোকাম্মেল হক চৌধুরী, সাবেক এমডি আব্দুল হামিদ মিয়া ও ওমর ফারুকসহ শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব ও অভ্যন্তরীণ যোগসাজশের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ ভুয়া ও নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ দেখিয়ে ব্যাংক থেকে বের করে নেওয়া হয়েছে।
দুদকের প্রাথমিক তথ্যমতে, ইউনিয়ন ব্যাংকের মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৬৪ শতাংশ এককভাবে নিয়েছে এস আলম গ্রুপ। এসব ঋণের বড় অংশের বিপরীতে কার্যকর কোনো জামানত ছিল না। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে ভুয়া আমদানি-রপ্তানি নথি, কাল্পনিক প্রতিষ্ঠান এবং কৃত্রিম লেনদেনের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার ঋণ অনুমোদনের তথ্য উঠে আসে। পরে সেই অর্থ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্থানান্তর ও আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান। দুদকের উপপরিচালক মশিউর রহমানের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি দল এ অভিযোগ অনুসন্ধান করছে। দলে রয়েছেন সহকারী পরিচালক মো. কামিয়াব আফতাব-উন-নবী, মো. সোহাকুল ইসলাম, উপসহকারী পরিচালক মো. ফারুক হোসেন এবং মো. সজিব আহমেদ। ইতোমধ্যে ইউনিয়ন ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে প্রয়োজনীয় নথিপত্র চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম বলেন, অভিযোগসংশ্লিষ্ট নথি সংগ্রহ করে দায়ীদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। তদন্তে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ইউনিয়ন ব্যাংক রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়ে আসছিল। ২০১৩ সালে কার্যক্রম শুরু করা ব্যাংকটি সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আমানত সংগ্রহে সক্রিয় ছিল। পরে সেই আমানতের বড় অংশ বিভিন্ন ট্রেডিং ও শেল কোম্পানির নামে ঋণ হিসেবে বের করে নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোর বাস্তব অস্তিত্বও ছিল না।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ব্যাংকটির জনবল নিয়োগেও ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের পটিয়া এলাকার লোকজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০২০ সালে এবিএম মোকাম্মেল হক চৌধুরী ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তিনি এস আলম পরিবারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হওয়ায় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে গ্রুপটির সরাসরি প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক বিশেষ পরিদর্শনে ইউনিয়ন ব্যাংকের গুলশান শাখার ভল্টে বড় ধরনের গরমিল ধরা পড়ে। কাগজে-কলমে যে পরিমাণ নগদ অর্থ থাকার কথা ছিল, বাস্তবে তার চেয়ে প্রায় ১৯ কোটি টাকা কম পাওয়া যায়। ব্যাংকিং বিধিমালা অনুযায়ী এমন ঘটনায় তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও রহস্যজনক কারণে তখন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চপর্যায় থেকেও বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়।
ব্যাংক খাত বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ব্যাংকিং খাতকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করেছে, যার একটি বড় উদাহরণ ইউনিয়ন ব্যাংক। তাদের মতে, শুধু ব্যাংক কর্মকর্তাদের নয়, ঋণ অনুমোদনে প্রভাব বিস্তারকারী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে ব্যাংকটির আর্থিক অনিয়ম ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের প্রকৃত চিত্র ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে শুরু করে। বর্তমানে ব্যাংকটির আর্থিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে বিশেষ তদারকি চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দুদকের চলমান অনুসন্ধান শেষ হলে এই অর্থ কেলেঙ্কারির বিষয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে।
