এবারের বাজেট অর্থবিলে অতীতের যেকোনো বছরের অপ্রদর্শিত ব্যয় শনাক্ত হলে তার ওপর জরিমানাসহ কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর লক্ষ্যে কর কর্মকর্তারা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অতীতের নথিপত্র পর্যালোচনার বাড়তি ক্ষমতা পাবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা করদাতাদের হয়রানির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা। এর আগে ২০২৩ সালের আয়কর আইনে ছয় বছর পর্যন্ত অপ্রদর্শিত সম্পদের ওপর কর আরোপের বিধান ছিল; নতুন প্রস্তাবে সেই ধারাকে সংশোধন করে সম্পদের পাশাপাশি করযোগ্য ব্যয়কেও অন্তর্ভুক্ত করে ব্যয়ের ওপরও সরাসরি কর আরোপের ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কর বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি এনবিআরকে অতীত অনুসন্ধানের “টাইম মেশিন” সদৃশ ক্ষমতা দেবে বলে মন্তব্য করা হয়েছে, যেখানে আগে শুধু সম্পদের ক্ষেত্রে এমন বিধান ছিল, আর এখন ব্যয়ের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থবিলে যা আছে
এবারের অর্থবিলের ২১২ ধারার ৪(খ) উপধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির অপ্রদর্শিত আয়, ব্যাখ্যাহীন ব্যয় বা লুকানো সম্পদ যদি আয়কর আইনের সাধারণ ছয় বছরের লুকব্যাক পিরিয়ডেরও বাইরে থাকে, তাহলে আইনত সেটি ষষ্ঠ (সবচেয়ে পুরোনো সচল) কর বছরে সংঘটিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হবে। অর্থবিল পাস হলে ছয় বছরেরও বেশি পুরোনো কোনো করযোগ্য ব্যয় পাওয়া গেলে কর কর্মকর্তা সেটিকে ওই ষষ্ঠ বছরের ব্যয় হিসেবে গণ্য করে সংশ্লিষ্ট কর আইনে কর নির্ধারণ করতে পারবেন এবং পরবর্তীতে টানা ছয় বছর অপরিশোধিত থাকায় বার্ষিক ১০ শতাংশ হারে জরিমানাসহ কর আদায়ের নোটিশ জারি করতে পারবেন।
বিশেষজ্ঞ পর্যবেক্ষণ
কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া এ পরিবর্তনের প্রভাব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একটি উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি জানান, যদি কোনো করদাতা আজ থেকে আট বছর আগে কোনো খাতে ১০ লাখ টাকা ব্যয় করে থাকেন, যা তখন তিনি আয়কর নথিতে দেখাননি, তাহলে বর্তমান আইনে কর কর্মকর্তা সেই ব্যয়টিকে ষষ্ঠ বছরের আয় হিসেবে গণ্য করে বর্তমান সময়ে করহারে কর আরোপ করতে পারবেন। ফলে আয়কর নথিতে জীবনযাপন সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের সঠিক তথ্য প্রদানই ভবিষ্যতে আপনাকে বড় ধরনের করভার থেকে বাঁচাতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি। কোম্পানি-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, তারা ভয় করছেন, বিশাল আকারের বাজেট বাস্তবায়নে বড় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে কর কর্মকর্তারা পুরোনো অনেক নথি চাইতে পারেন। এ নিয়ে হয়রানির স্বীকার হওয়ার শঙ্কার কথাও জানান তারা।
পেশাদার চার্টার্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং কর বিশেষজ্ঞ এমবিএম লুৎফুল হাদী মনে করেন, যারা আইন মেনে চলেন, তাদের এ বিধান নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তবে এটাও ঠিক, আগে সবার মধ্যে এ ধারণা বদ্ধমূল ছিল, ছয় বছর আগের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না। এ প্রস্তাব সে ধারণা ভেঙে দিয়েছে। এই কর বিশেষজ্ঞ সমকালকে বলেন, ফৌজদারি অপরাধের বিচারের কোনো সময়সীমা থাকে না, এটা ঠিক। কিন্তু আর্থিক ক্ষেত্রে এর একটা সীমা থাকা উচিত।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো হবে
শুধু আইনি বিধান নয়, এ ব্যবস্থা বাস্তবায়নে এনবিআরের সক্ষমতাও বাড়ানো হবে। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্য অনুযায়ী ‘সেন্ট্রাল ডেটা ইন্টিগ্রেশন’ ব্যবস্থা চালু করা হবে, যার মাধ্যমে এনবিআরের তথ্যভান্ডার জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক, ইউটিলিটি সেবা এবং সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। এতে করদাতার আয়, ব্যয় বা সম্পদ সংক্রান্ত তথ্য গোপন করা হচ্ছে কি না, তা সহজেই যাচাই করা সম্ভব হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। অর্থমন্ত্রী আরও জানান, এই ডিজিটাল সংযোগ কর ফাঁকি রোধে সহায়ক হবে এবং করদাতার প্রকৃত আর্থিক চিত্র নির্ণয় সহজ করবে। পাশাপাশি কর ফাঁকি শনাক্তে ঝুঁকিভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় অডিট নির্বাচন পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে, যেখানে মানব হস্তক্ষেপ ছাড়াই অডিট নির্ধারণ করা হবে।
