অগ্নিকাণ্ডের ছয় মাসেও নির্মাণ হয়নি নতুন ওয়্যারহাউজ

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর

দেশের প্রধান বিমানবন্দর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে খোলা আকাশের নিচে রানওয়েতে পড়ে রয়েছে মূল্যবান আমদানি-রপ্তানি পণ্য, শিল্পকারখানার কাঁচামাল ও দামী যন্ত্রপাতি। বৃষ্টি ও তীব্র গরমে এসব পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে একদিকে ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতি বাড়ছে, অন্যদিকে দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত এই বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তবে এ অবস্থার দায় স্বীকার করতে রাজি নয় সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ।

কার্গো কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এবং অবকাঠামোর মালিক বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (ক্যাব) একে অপরের ওপর দায় চাপাচ্ছে। এদিকে, জবাবদিহির অভাবে ক্ষতির বোঝা বইতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদেরই। মূল কার্গো গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ছয় মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এতে ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতি বাড়ার পাশাপাশি দেশের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে বিমানবন্দরের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

এখনও নির্মাণ হয়নি নতুন ওয়্যারহাউজ

গত বছরের ১৮ অক্টোবরের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বিমানবন্দরের কার্গো ওয়্যারহাউজ পুড়ে যাওয়ার পর ছয় মাসের বেশি সময় পার হলেও এখনো নতুন গুদাম নির্মাণ করা হয়নি। অগ্নিকাণ্ডের পর সাময়িকভাবে তিন মাসের জন্য একটি অস্থায়ী গুদামের ব্যবস্থা করা হয়, যার অর্থায়ন করে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। সংগঠনটির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, এ গুদাম ভাড়ার জন্য নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। তিনি বলেন, খোলা আকাশের নিচে পড়ে থেকে পণ্য নষ্ট হওয়ায় দ্রুত নতুন ওয়্যারহাউজ স্থাপনের জন্য সরকারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা এখন মূলত তৃতীয় টার্মিনাল চালুর দিকেই বেশি নজর দিচ্ছে।

লোকসান গুনছেন ব্যবসায়ীরা

শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা বলছেন, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে ইতোমধ্যেই বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (বিএপিআই) মহাসচিব ড. মো. জাকির হোসেন বলেন, আমরা বিমান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি। পণ্য নষ্ট হওয়া ঠেকাতে দুটি কোল্ড রুম ও অস্থায়ী টেন্টের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে জায়গা কম থাকায় ৩-৪ দিনের বেশি পণ্য রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি আরও বলেন, সামনে বর্ষা মৌসুম আসায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে। জায়গা সংকটের কারণে পণ্য জমে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়। এরপর দ্রুত কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে পণ্য খালাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ৩০ মার্চ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের উপ-মহাব্যবস্থাপক (কার্গো আমদানি) মো. জাহিদুজ্জামান বিজিএমইএ সভাপতিকে পাঠানো এক চিঠিতে জানান, আমদানিকৃত মালামালের আধিক্যের কারণে প্রয়োজনীয় গুদাম সুবিধা না থাকায় অধিকাংশ পণ্য গুদামের বাইরে রাখা হচ্ছে। এতে বৃষ্টি ও প্রখর রোদে মূল্যবান পণ্যের গুণগতমান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বিষয়টি বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও যথাযথ হ্যান্ডলিং কার্যক্রমের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। চিঠিতে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে আমদানিকৃত পণ্য দ্রুত খালাসের অনুরোধ জানানো হয়।

পাল্টাপাল্টি দোষারোপ

বিমান কর্মকর্তাদের দাবি, নতুন স্থাপনা নির্মাণের জন্য তারা বারবার ক্যাবকে অনুরোধ জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, তারা শুধু জায়গাটি ভাড়া নিয়ে পরিচালনা করে, সেখানে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের এখতিয়ার তাদের নেই। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মুখপাত্র বোসরা ইসলাম বলেন, অগ্নিকাণ্ডের পর সিভিল এভিয়েশন দুটি অস্থায়ী কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করেছে এবং ওয়্যারহাউজ আংশিক সংস্কার করেছে। সেখানে প্রায় ১০০ টন পণ্য রাখা যায়, অথচ প্রতিদিন প্রায় ৬০০ টন কার্গো আসে। বাকি পণ্য খোলা আকাশের নিচে রাখতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ওয়্যারহাউজের মালিক সিভিল এভিয়েশন। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস থেকে তাদের কয়েকবার চিঠি দিয়ে দ্রুত ওয়্যারহাউজ নির্মাণের অনুরোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিজিএমইএ ও ফার্মাসিউটিক্যাল মালিকদের সংগঠনকেও অনুরোধ করেছি, যাতে পণ্য আসার পর দ্রুত খালাস করে নেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, কাস্টমস কর্তৃপক্ষকেও চিঠি দিয়ে দ্রুত কার্গো খালাসের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে, কারণ পণ্য সংরক্ষণের মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই। বোসরা ইসলাম বলেন, বিমানের আসলে কিছু করার নেই। আমরা কয়েকবার সিভিল এভিয়েশনকে চিঠি দিয়েছি। এখন তারাই বলতে পারবে, কবে কী করবে।

অন্যদিকে, সিভিল এভিয়েশনের পক্ষে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন রাগীব সামাদ বলেন, ১৮ অক্টোবরের আগুনের পর অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে তিন মাসের জন্য অস্থায়ী শেড তৈরি করা হয়েছিল। পুড়ে যাওয়া অংশ আংশিক মেরামত করে কার্গো সংরক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়। তবে তিনি বলেন, যে পরিমাণ কার্গো আসছে, সে পরিমাণ পণ্য সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও রিসিপিয়েন্টরা খালাস করছেন না। সে কারণেই জায়গা সংকট তৈরি হচ্ছে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা মেরামত করে নতুনভাবে চালু করা সহজ কাজ নয়। তিনি আরও বলেন, আমরা জানি বর্ষা আসছে, বৃষ্টিতে পণ্য ভিজছে। কিন্তু যারা কনসাইনমেন্ট আনছেন, তারা দ্রুত পণ্য নিয়ে গেলে এ পরিস্থিতি তৈরি হতো না। কাস্টমস, বিমান ও সিভিল এভিয়েশনের কর্মকর্তারা প্রস্তুত থাকলেও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা সন্ধ্যার পর পণ্য ডেলিভারি নেয় না। এমনকি সরকারি ও সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও তারা পণ্য খালাস করে না।

রাগীব সামাদ জানান, বৃহস্পতিবার কার্গোর পরিমাণ ২০০ টনে নেমে এসেছিল। কিন্তু শুক্রবার ও শনিবার পণ্য খালাস না হওয়ায় তা বেড়ে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টনে পৌঁছায়। তিনি বলেন, যারা সময়মতো পণ্য ডেলিভারি নিচ্ছেন না, তাদের উচিত বিমানের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত পণ্য খালাস করা। সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির দিনে কেন পণ্য খালাস হয় না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আরিফুল আহসান বলেন, তিনি সম্প্রতি সংগঠনের দায়িত্ব নিয়েছেন। তাই এ বিষয়ে এখনই মন্তব্য করতে চান না।

সমন্বিত উদ্যোগের পরামর্শ

খায়রুল আলম সুজন বলেন, বিমানপথে আমদানি হওয়া পণ্য সাধারণত জরুরি ও উচ্চমূল্যের হয়ে থাকে, তাই এসব পণ্য খোলা আকাশের নিচে পড়ে থেকে নষ্ট হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ সংকট সমাধানে এলসি খোলা ব্যাংক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, কাস্টমস ও সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষকে সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার পরামর্শ দেন তিনি। সংগঠনটির সাবেক এই নেতা আরও জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দরের কার্গো গুদামে বহুতল র্যাকিং ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়, যার মাধ্যমে একই স্থানে বিপুল পরিমাণ ও নানা ধরনের পণ্য সংরক্ষণ সম্ভব। তার মতে, বাংলাদেশে এখনো এ ধরনের আধুনিক ব্যবস্থা চালু হয়নি। তিনি বলেন, ১ লাখ বর্গফুটের একটি গুদামে চার স্তরের উল্লম্ব র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা গেলে তা কার্যত ৪ লাখ বর্গফুট গুদামের সমপরিমাণ পণ্য ধারণ করতে সক্ষম হবে।

** খোলা আকাশের নিচে আমদানি করা পণ্যের স্তূপ
** বিমানবন্দরের বাইরে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স চালুর উদ্যোগ
** অগ্নিকাণ্ডে ১২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি: ইএবি
** কার্গো গুদামে ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ রাসায়নিক পদার্থ
** ২০০ কোটি টাকার ওষুধের কাঁচামাল পুড়েছে
** ক্ষতির পরিমাণ ছাড়াতে পারে হাজার কোটি টাকা
** আগামী ৩ দিন ‘নন শিডিউলড’ ফ্লাইটের খরচ মওকুফ
** অগ্নিকাণ্ডের ক্ষতি নিরূপণে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন
** শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুন
** ক্ষতির পরিমাণ ১০০ কোটি টাকার বেশি: বিজিএমইএ