৬৯ প্রতিষ্ঠান থেকে ফাঁকি দেওয়া ২৪ কোটি টাকা আদায়

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের এআইআর এর সাফল্য

** শুল্ককর ফাঁকির তালিকায় বহুজাতিক কোম্পানি বার্জার পেইন্টস রয়েছে
** শুল্কফাঁকির তালিকায় বাংলাদেশ ল্যাম্পস পিএলসি, আকিজ কমোডিটি লি., আরএফএল ইলেকট্রনিক্স লি., লিনেক্স ইলেকট্রনিক্স বাংলাদেশ, সুপার পেট্টো কেমিক্যাল পিএলসি, ইউনিস্টার টেক্সটাইল, ডায়মন্ড স্টিল প্রোডাক্টস প্রা. লি., হালিমা ইলেকট্রনিক্স, সিরামিক গ্যালারি, সালাম স্টিল, নাসির সিনট্যাক্স অ্যালুমিনিয়াম ইন্ডাস্ট্রিজ লি., মনোস্পুল বাংলাদেশ পিএলসি ইত্যাদি

অনিয়মের ধরণ বলে দেয় শুল্ককর ফাঁকি দিতে প্রতিষ্ঠানগুলো কত ফন্দিফিকিরের আশ্রয় নেয়। কখনো এক পণ্য ঘোষণায় অন্য পণ্য আমদানি, কখনো ঘোষিত পণ্যের সঙ্গে ঘোষণা বর্হিভূত পণ্য আমদানি, কখনো এক এইচএস কোডের পণ্য অন্য এইচএস কোডে আমদানি, কখনো ঘোষণার অতিরিক্ত পণ্য আমদানি-এ যেন রাজস্ব ফাঁকি দিতে মহাকাব্য রচনা। তবে কাস্টমস কর্মকর্তারাও বসে নেই। শুল্ককর ফাঁকির হাজারো ফন্দিফিকির রোধ করে শুল্ককর আদায়ে তারা মরিয়া। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অডিট, ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিসার্চ (এআইআর)। এই শাখা শুল্ককর ফাঁকির এসব ফন্দিফিকির বা ফাঁকফোকর রোধ করে মাত্র একমাসে ৬৯টি কোম্পানি ও আমদানিকারক থেকে জরিমানাসহ প্রায় ২৪ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করেছে। রাজস্ব ফাঁকির তালিকায় বহুজাতিক কোম্পানি থেকে শুরু করে দেশীয় শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠান, ছোট-বড় আমদানিকারক রয়েছে। এনবিআর সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

সূত্রমতে, কোন পণ্য চালানে সন্দেহ হলে, আবার কখনো তথ্যের ভিত্তিতে আমদানি করা পণ্য চালানের খালাস স্থগিত বা বিআইএন লক করে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অভ্যন্তরীণ এই গোয়েন্দা শাখা। সম্প্রতি শুল্ককর ফাঁকির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় এই শাখা তাদের নজরদারি বাড়িয়ে দেয়। তবে থেকে থাকে না অসাধু আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট। এই শাখা জুলাই মাস ও তার আগে লক করা চালানের বিপরীতে প্রায় ২৪ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করেছে। অনিয়ম ও ফাঁকির তালিকায় রয়েছে বহুজাতিক কোম্পানি বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি সোলার প্যানেলের জন্য স্টিল স্ট্রাকচার আমদানি করেছে। তবে ভুল এইচএস কোডে পণ্য খালাসের ঘোষণা দেয় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট টি ডব্লিউ এক্সেপ্রেস। পরে প্রতিষ্ঠান থেকে জরিমানাসহ ২৫ লাখ ১০ হাজার টাকা অতিরিক্ত শুল্ককর আদায় করা হয়।

শুল্ককর ফাঁকির তালিকায় দেশীয় শিল্পগোষ্ঠী

তালিকায় দেখা গেছে, আকিজ গ্রুপের আকিজ কমোডিটিজ লিমিটেড গুঁড়ো দুধের চালানে কার্নেশন মিল্ক ও ফুড প্রিপারেশনের কোড বদলে ২২ লাখ ৮১ হাজার টাকা ফাঁকির পর ধরা পড়ে। রেয়াতি হারের সুবিধা পাওয়ার জন্য কাস্টমস প্রসিডিউর কোড বা সিপিসি জালিয়াতি করে আরএফএল গ্রুপের প্রতিষ্ঠান। আরএফএল ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড ফ্রিজের কাঁচামাল আমদানিতে সুকৌশলে কম রেয়াতি হারের পণ্য বেশি এবং উচ্চ রেয়াতি হারের পণ্য কম দেখিয়ে ৪৭ লাখ ৫৮ হাজার টাকা ফাঁকির চেষ্টা চালায়। সালাম স্টিল রি-রোলিং মিলস স্টিমার মেশিনারিজ আমদানিতে কাস্টমস সিপিসি পরিবর্তন করে ৩৫ লাখ ২০ হাজার টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেয়। টান্সকম গ্রুপের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ল্যাম্পস পিএলসি সুইচের মেটাল পার্টস আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে ১৭ লাখ ৬২ হাজার ও ঘোষণার অতিরিক্ত মেটাল পার্টস আমদানি করে ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা জরিমানাসহ অতিরিক্ত শুল্ককর পরিশোধ করে। পুঁজিবাজার তালিকাভুক্ত সুপার পেট্টোকেমিক্যালস পাম্পের যন্ত্রাংশের সঙ্গে স্লিভ ও স্পেসারের তথ্য গোপন করে ২ লাখ ৬৩ হাজার টাকা শুল্ককর দিয়েছে। লিনেক্স ইলেকট্রনিক্সস বাংলাদেশ লিমিটেড ঘোষণার অতিরিক্ত পণ্য আমদানি করে ১ কোটি ৮২ লাখ টাকা ও ৭২ লাখ ৭৭ হাজার টাকা শুল্ককর ফাঁকি দিয়ে পরিশোধ করে।

শুল্ককর ফাঁকির তালিকায় আরো যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে-

ঘোষিত পণ্যের আড়ালে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্য গোপন করে আনা হয়েছে। ইউনিস্টার টেক্সটাইল সেকেন্ড হ্যান্ড পাওয়ার লুমের চালানে স্ক্রু, ট্রাইসাইকেল শক কানেকশন, সাইকেল লক, রিয়ার ডিফারেনশিয়াল এক্সেল গোপন করে একক চালানে সর্বোচ্চ ২ কোটি ১০ লাখ টাকা ফাঁকিতে অভিযুক্ত হয়ে অতিরিক্ত কাস্টমস শুল্ক ও জরিমানা প্রদান করে। এম এ টেক্সটাইল সুতা তৈরির মেশিনারিজের আড়ালে ইলেকট্রিক স্কুটি, নাট-বল্টু ও সি-সল্ট এনে ৯১ লাখ ৪৪ লাখ টাকা জরিমানা ও শুল্ক দেয়। উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্যকে কম শুল্কের কোডে শ্রেণীবদ্ধ করে কর ফাঁকির অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। ট্রেডস্টেপ লাইন ভ্যাকুয়াম ব্লাড কালেকশন টিউবকে গ্লাস টিউব বানিয়ে ৭১ লাখ ৯ হাজার টাকা এবং ঘোষিত পরিমাণের চেয়ে অতিরিক্ত কন্টেইনারজাত পণ্য এনে শুল্ক না দিয়ে খালাসের চেষ্টা করা হয়। লিনেক্স ইলেকট্রনিক্স বাংলাদেশ স্মার্টফোনের এলসিএম চালানে ৫৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ (১২৭০ কেজি) অতিরিক্ত পণ্য এনে ১ কোটি ৮২ লাখ টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব ও জরিমানা দেয়। মেসার্স সিরামিক গ্যালারি সিরামিক টাইলস চালানে ২০৯৪.৭২ বর্গমিটার অতিরিক্ত এনে ৭২ লাখ ২৩ হাজার টাকা রাজস্ব দিতে বাধ্য হয়। এছাড়া আমদানিকারক এমএ এন্টারপ্রাইজ অতিরিক্ত জিআইওয়্যার আমদানিতে ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, ডায়মন্ড স্টিল প্রোডাক্টস প্রা. লিমিটেড ফেরাস ওয়েস্ট ও স্ক্র্যাপ ঘোষণায় অতিরিক্ত ফেরাস ওয়েস্ট ও স্ক্র্যাপ এবং ঘোষণা বর্হিভূত হট রোল শিট পাওয়ায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা অতিরিক্ত শুল্ককর আদায়, ট্রেড মার্ট ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, মেসার্স রফি ইমপেক্স ৭৪ লাখ ৯২ হাজার টাকা, মন্নান মোটরস ৬৭ লাখ ৭৭ হাজার টাকা, ভেনাস ট্রেডিং ৩৮ লাখ ২৮ হাজার টাকা, আইএন এন্টারপ্রাইজ ২৮ লাখ ৭৯ হাজার টাকা, বাংলাট্রনিক্স টেকনোলজি ২৮ লাখ ৭৩ হাজার টাকা, ফাতেমা ট্রেডিং ২৮ লাখ ৭১ হাজার টাকা, ওয়েলকাম ট্রেডিং ২৯ লাখ ৮ হাজার টাকা, মেসার্স সার্ফিং ট্রেডিং আমদানি নিষিদ্ধ ব্যবহৃত সাউন্ড সিস্টেম আমদানি, কাব্য ইন্টারন্যাশনাল ২২ লাখ ৭৩ হাজার টাকা,

এমএ এন্টারপ্রাইজ ১ কোটি ৫৫ লাখ, এমএ টেক্সটাইল ৯১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা, মান্নান মোটরস ৬৭ লাখ ৭৭ হাজার টাকা, মেসার্স অনিক্স এন্টারপ্রাইজ ৬৭ লাখ ৭২ হাজার টাকা, প্রিন্ট টেকনোলজিস ৫২ লাখ ৫২ হাজার, মেসার্স জিয়া গার্মেন্টস ৫০ লাখ টাকা, হামিম ইলেকট্রনিক্স ৪৮ লাখ ৫৮ হাজার টাকা, এসই এন্টারপ্রাইজ ৯ লাখ ৭২ হাজার টাকা, আজমি এন্টারপ্রাইজ ৪৩ লাখ ১৯ হাজার টাকা, ট্রেড ইস্ট ওয়েস্ট কর্পোরেশন লিমিটেড ৪০ লাখ ৩৩ হাজার টাকা, ভেনাস ট্রেডিং কর্পোরেশন ৩৮ লাখ ২৮ হাজার টাকা, সালাম স্টিল রি-রোলিং মিলস (প্রা.) লিমিটেড ৩৫ লাখ ২০ হাজার টাকা, মানিক অ্যান্ড ব্রাদার্স ৩৪ লাখ ৭৮ হাজার টাকা, তানিশা এন্টারপ্রাইজ ৩৬ লাখ ৪৩ হাজার টাকা, ওয়েলকাম ট্রেডিং ২৯ লাখ ৮ হাজার টাকা, আই.এন এন্টারপ্রাইজ ২৮ লাখ ৭৯ হাজার টাকা, বাংলাট্রনিক্স টেকনোলজি লিমিটেড ২৮ লাখ, ফাতেমা ট্রেডিং ২৮ লাখ ৭১ হাজার টাকা, আজওয়াহ ট্রেডিং ২৬ লাখ ৬৫ হাজার টাকা, বঙ্গা বিল্ডিং মেটেরিয়ালস লিমিটেড ২৩ লাখ ৬৪ হাজার টাকা, মেসার্স আইবিডি নেটওয়ার্ক ২২ লাখ ৭৩ হাজার টাকা, অটো হাউস ২২ লাখ, বিসমিল্লাহ বিজনেস জোন ২১ লাখ ৭০ হাজার টাকা, অয়ান টেলিকম ১৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা, হাইড্রোকেম বাংলাদেশ ১৬ লাখ ৭৯ হাজার টাকা, আরবি ট্রেডার্স ১৬ লাখ ৫৩ হাজার টাকা, জুলি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ১৬ লাখ ৯৪ হাজার টাকা, আনিকা ইন্টারন্যাশনাল ১৫ লাখ ৭৪ হাজার টাকা, আর.কে ট্রেডার্স ১৩ লাখ ৮৭ হাজার টাকা, আইডিয়াল এন্টারপ্রাইজ ১৩ লাখ ১৭ হাজার টাকা, মেসার্স জয়নাল মোটরস ১১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, নাশির এন্টারপ্রাইজ ১১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা, গোল্ডেন ইন্টারন্যাশনাল বিডি লিমিটেড ১০ লাখ ৩৫ হাজার টাকা, নাসির সিনটেক্স অ্যালুমিনিয়াম ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ১০ লাখ ৩৫ হাজার টাকা, বিল্টেক ডিস্ট্রিবিউশন ১০ লাখ টাকা, রেদোয়ান ট্রেডিং কর্পোরেশন ৯ লাখ টাকা, সাদিয়া এন্টারপ্রাইজ ৮ লাখ ৭৪ হাজার টাকা, ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি ৮ লাখ ২০ হাজার টাকা, সেঞ্চুরি ট্রেড ৭ লাখ ৬৮ হাজার টাকা, আরিশা ফ্যাশন ৭ লাখ ৪৯ হাজার টাকা, এম. এন. এক্সেসরিজ লিমিটেড ৭ লাখ ৪৯ হাজার টাকা, সভাব ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানি ৭ লাখ ১৮ হাজার টাকা, এজেএ ইন্টারন্যাশনাল ৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা, মনোপুল বাংলাদেশ পিএলসি ৫ লাখ ৬৮ হাজার টাকা, মেসার্স সানোয়ার ক্রোকারিজ ৫ লাখ ১৮ হাজার টাকা, এলিট এন্টারপ্রাইজ ১১ লাখ ৬১ হাজার টাকা, ভিশন এন্টারপ্রাইজ ৪ লাখ ৫২ হাজার টাকা, আমিগো পলিফাইবার কো. লিমিটেড ৮ লাখ ৩৬ হাজার টাকা, সোহাগ এন্টারপ্রাইজ ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা, মাদার অ্যান্ড সন্স ইন্টারন্যাশনাল ৩ লাখ ৫ হাজার টাকা, রি-বিল্ড কম্পিউটার ২ লাখ ৯৯ হাজার টাকা, জিল্লু অটো কর্পোরেশন ২ লাখ ৯৫ হাজার টাকা, এফ আহমেদ ট্রেডিং ২ লাখ ৬৮ হাজার টাকা, মেসার্স কাশফুল এন্টারপ্রাইজ ১ লাখ ৯৬ হাজার টাকা, ট্রেড এক্স ইন্টারন্যাশনাল ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা।

কাস্টমস কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ফাঁকিবাজ চক্রের বিরুদ্ধে আধুনিক ডাটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে জিরো টলারেন্স নীতিতে অভিযান অব্যাহত থাকবে।