** বন্ডের কাঁচামাল অবৈধভাবে অপসারণের অভিযোগ রয়েছে, বন্ড মামলাও করেছে
** ২০ চালানে ৮ লাখ ৬১ হাজার ৮৪৮ ডলারের রপ্তানি আয় আসেনি
** এনওসি ছাড়াই বন্ডের কাঁচামাল খালাসের অভিযোগ
** বন্ড সুবিধার অপব্যবহারে ৪৬ লাখ টাকা রাজস্ব পাওনা
** কাঁচামাল অবৈধ অপসারণে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা
কোনো পণ্য চালান রয়েছে ২২ মাস হয়েছে। আবার কোনো কোনো চালান রপ্তানি হয়েছে ১৫-২১ মাস হয়েছে। কিন্তু রপ্তানির টাকা দেশে আসেনি। যদিও রপ্তানির টাকা ১২০ দিন বা ৪ মাসের মধ্যে দেশের আনার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু আমানা নিটটেক্স লিমিটেডের ক্ষেত্রে নিয়ম যেনো উল্টো। প্রতিষ্ঠানটির সংযুক্ত আরব আমিরাতে রপ্তানি করা প্রায় ২০ চালানের টাকা দেশে আসেনি। যার পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি টাকা। রপ্তানিতে ‘ওভারডিউ’ থাকলে ব্যাংক থেকে যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে প্রত্যয়ন (এনওসি) নিতে হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ওভারডিউ থাকলেও ব্যাংকের এনওসি না নিয়েই চলছে বন্ড সুবিধার কাঁচামাল খালাস। তবে এতমাস পেরিয়ে গেলেও রপ্তানির টাকা দেশে না আসায় তা পাচারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু রপ্তানিতে ওভারডিউ নয়, নারায়নগঞ্জের আমানা নিটটেক্স লিমিটেডের বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধার কাঁচামাল অবৈধভাবে অপসারণের অভিযোগ রয়েছে, যা নিয়ে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট মামলাও করেছে। শুধু আমানা নিটটেক্স নয়, আমানা টেক্সটাইলেরও বিরুদ্ধেও বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের একই অভিযোগ রয়েছে। এনবিআর সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
ব্যাংক ও বন্ড কমিশনারেট সূত্রমতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতিমালার নির্দেশিকা অনুযায়ী রপ্তানি পণ্যের জাহাজিকরণের পর সাধারণত ১২০ দিন বা ৪ মাসের মধ্যে রপ্তানি আয় দেশে (প্রত্যাবাসন) আনার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু নারায়নগঞ্জের ফতুল্লা গাবতলী মোড় গোরস্থান মাসদাইরের শতভাগ রপ্তানিমুখী নিট গার্মেন্টস প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আমানা নিটটেক্স ২০২৪ ও ২০২৫ সালে যে পণ্য রপ্তানি করেছে, তার টাকা দেশে আসেনি। প্রতিষ্ঠানটি এই দুই বছর সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) ২০টি চালানে পণ্য রপ্তানি করেছে। এতে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি সবগুলো চালান এআরজি ট্রেডিং এলএলসি নামক প্রতিষ্ঠানে রয়েছে করেছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট ৫০ হাজার ৩৭৬ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই চালানের ৬১৭ দিন বা ২০ মাসের বেশি ওভারডিউ হলেও টাকা দেশে আসেনি। একইভাবে ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর ৩৫ হাজার ২৬৮ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, ৫৬১ দিন বা ১৮ মাস পার হলেও টাকা দেশে আসেনি। ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট ৫১ হাজার ৫০৮ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। ৬১৭ দিন বা ২০ মাস পার হলেও টাকা আসেনি। একই বছরের ৮ আগস্ট ৫১ হাজার ৮৮০ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। ৬২৪ দিন বা ২০ মাসের বেশি হলেও টাকা আসেনি। ১৩ আগস্ট ৫১ হাজার ৯৭৮ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। ৬১৯ দিন বা ২০ মাসের বেশি হলেও টাকা দেশে আসেনি। ৪ আগস্ট ৫২ হাজার ৪৭৯ ডলার পণ্য রপ্তানি হয়েছে। ৫২৮ দিন বা ১৭ মাসের বেশি হলেও টাকা আসেনি। একইদিন ৫০ হাজার ৪২৬ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে।
৫২৮ দিন বা ১৭ মাসের বেশি হলেও টাকা আসেনি। ১৪ জুলাই ৫০ হাজার ৬৮১ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। ৬৪৮ দিন বা ২১ মাসের বেশি হলেও টাকা দেশে আসেনি। ৬ জুলাই ৫১ হাজার ৪৪০ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। ৬৫৬ দিন বা ২১ মাসের বেশি হলেও টাকা দেশে আসেনি। ৯ নভেম্বর ৩০ হাজার ৭৫৪ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। ৫৩৩ দিন বা ১৭ মাসের বেশি হলেও টাকা দেশে আসেনি। ৩ অক্টোবর ৫৪ হাজার ২৮ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। ৫৬৭ দিন বা ১৮ মাসের বেশি হলেও টাকা দেশে আসেনি। ১৭ সেপ্টেম্বর ৪৯ হাজার ২১৫ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। ৫৮৪ দিন বা ১৯ মাসের বেশি হলেও টাকা দেশে আসেনি। ২৮ নভেম্বর ২৯ হাজার ৩ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। ৫১৪ দিন বা ১৭ মাসের বেশি হলেও টাকা আসেনি। ১৯ নভেম্বর ২৯ হাজার ৬৭৪ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। ৫২৩ দিন বা ১৭ মাসের বেশি হলেও টাকা আসেনি। ২৯ আগস্ট ৫৫ হাজার ৫০৬ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। ৬০৩ দিন বা ২০ মাস হলেও টাকা দেশে আসেনি। ৬ সেপ্টেম্বর ৫৫ হাজার ৪০০ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। ৫৯৫ দিন ওভারডিউ হলেও টাকা আসেনি। একইদিন ৫৪ হাজার ৪২১ ও ৫৫ হাজার ৫০ ডলারের পণ্য রপ্তানি হলেও টাকা আসেনি। ২০২৫ সালের ৪ জুন ২ হাজার ৭৫৩ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। ৩২৪ দিন অতিবাহিত হলেও টাকা দেশে আসেনি। ২০টি চালানে মোট ৮ লাখ ৬১ হাজার ৮৪৮ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১০ কোটি টাকার বেশি। ২০টি চালানে সর্বনিম্ন ৩২৪ দিন থেকে সর্বোচ্চ ৬৫৬ দিন ওভারডিউ হয়ে গেছে, কিন্তু রপ্তানির টাকা দেশে আসেনি।
এই বিষয়ে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিজনেস বার্তাকে বলেন, ওভারডিউ থাকলে ব্যাংক থেকে এনওসি ছাড়া কাঁচামাল খালাস করা যায় না। কিভাবে এই প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল খালাস করেছে, তা কাস্টমসকে ভালো করে দেখতে হবে। আর ওভারডিউ এর সঠিক কারণ ব্যাখ্যা দিতে না পারলে বুঝতে হবে টাকা পাচার হয়েছে। এরপরও তদন্ত করে দেখা উচিত।
অপরদিকে, আমানা নিটটেক্স লিমিটেডের বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধার কাঁচামাল অবৈধভাবে অপসারণ করে খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট যার প্রমাণ পেয়েছে। যাতে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা ও বিচারাদেশ দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করায় জরিমানাসহ ৪৬ লাখ ৪৫ হাজার ২৯০ টাকা রাজস্ব বকেয়া রয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি আমানা নিটটেক্স এর বিরুদ্ধে বন্ডের কাপড় অবৈধভাবে অপসারণ করায় ১১ লাখ ৭১ হাজার ২২৭ টাকা মামলা করে বন্ড। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়া অননুমোদিত এইচএস কোড ব্যবহার করে বন্ড সুবিধায় পণ্য আমদানি করায় ২৪ লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে মামলা করা হয়। ২ লাখ ৬৩ হাজার ৩৬৭ টাকা শুল্ককর ফাঁকির অভিযোগে আমানা টেক্সটাইল লিমিটেডের বিরুদ্ধে মামলা করেছে বন্ড।
এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে আমানা নিটটেক্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান খন্দকার সাইফুল ইসলামকে ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। বক্তব্যের বিষয় হোয়াটসঅ্যাপে লিখে দেওয়া হলে তিনি সিন করেন। তবে কোন জবাব দেননি।
