১৪৬ কোটি টাকার করকে শূন্য করে চাকরি হারালেন কর্মকর্তা

বেস্ট হোলিংসের প্রতিষ্ঠানকে কর সুবিধা

ধামসুর ইকোনমিক জোন লিমিটেড। এটি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ও ‘লে মেরিডিয়ান ঢাকা’ হোটেলের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বেস্ট হোল্ডিংস লিমিটেডের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ করবর্ষে উপকর কমিশনার দুইটি মামলা করলেন। যার বিপরীতে কর নির্ধারণ করলেন প্রায় ৭২ কোটি টাকা ও প্রায় ৭৩ কোটি টাকাসহ মোট প্রায় ১৪৬ কোটি টাকা। উপকর কমিশনার ওই সার্কেল থেকে বদলি হলেন। মামলা দুইটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে অডিটের জন্য নির্বাচিত হলো। নতুন উপকর কমিশনার সার্কেলে বদলি হয়ে আসলেন। আসার সঙ্গে সঙ্গে কর হয়ে গেলো ৭২ কোটি টাকার জায়গায় শূন্য আর ৭৩ কোটি টাকার জায়গায় ১২৯৯ টাকা। অবিশ্বাস গতিতে আলাউদিনের চেরাগের ছোঁয়ায় কর-ই কমলো না, দুইটি মামলার নথিও গায়েব হয়ে গেলো। কর অঞ্চল-৫, ঢাকায় এমন তুঘলকি কান্ড ঘটিয়ে চাকরি হারালেন অভিযুক্ত উপকর কমিশনার লিংকন রায়। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিব সই করা প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। লিংকন রায় বর্তমানে উৎসে কর ব্যবস্থাপনা ইউনিট, ঢাকায় কর্মরত। এর আগে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করে প্রমাণ পায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বিষয়টি সামনে আসার পর লিংকন রায়কে সাময়িক বরখাস্ত করে এনবিআর।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, লিংকন রায় ২০২২ সালের ১৪ আগস্ট থেকে ২০২৩ সালের ২৭ আগস্ট কর অঞ্চল-৫, ঢাকার সার্কেল-৯০ (কোম্পানীজ) কর্মরত ছিলেন। এর আগে এই সার্কেলে কর্মরত ছিলেন উপকর কমিশনার জানে আলম। জানে আলম করদাতা কোম্পানি ধামসুর ইকোনোমিক জোন লিমিটেডের ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ করবর্ষের দুইটি মামলা করেন। কিন্তু লিংকন রায় নতুন আদেশপত্র ও কর নির্ধারণ আদেশ তৈরির মাধ্যমে নতুন কর দাবি সৃষ্টি করে সরকারের ১৪৬ কোটি ৫৭ লাখ ৪৬ হাজার ৫৫৩ টাকা রাজস্ব ক্ষতি করেন। তার এই কাজে ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’ এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী অসদাচরণ এর পর্যায়ভুক্ত শাস্তিযোগ্য অপরাধ হওয়ায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। একইসঙ্গে অভিযোগ বিবরণী ও অভিযোগনামা জারি করে কারণ দর্শাতে বলা হয়। এই কর্মকর্তা জবাব দাখিল করেন। ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর শুনানি গ্রহণ করা হয়। বিষয়টি তদন্ত করতে কর আপীল অঞ্চল-২, ঢাকার কর কমিশনার মুন্সী হারুনর রশিদকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। তিনি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। যাতে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়। সে অনুযায়ী এই কর্মকর্তাকে গুরুদণ্ড হিসেবে চাকরি হতে বরখাস্তকরণের সিদ্ধান্ত হয়, যা প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হয়েছে।

দুদক সূত্র জানিয়েছে, একটি করদাতা কোম্পানির আয়কর নথি গায়েব করে সরকারের ১৪৬ কোটি ৫৭ লাখ ৪৬ হাজার ৫৫৩ টাকা রাজস্ব ক্ষতির অভিযোগে ঢাকার কর অঞ্চল-৫, সার্কেল-৯০ (কোম্পানীজ) অফিসে সম্প্রতি অভিযান চালিয়েছে দুদক। দুদকের প্রধান কার্যালয়ের একটি এনফোর্সমেন্ট টিম ওই অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানকালে ১৪৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা কম কর নির্ধারণী আদেশের মূল ফাইলগুলো খুঁজে পাওয়া যায়নি। এগুলো উদ্দেশ্যমূলকভাবে গায়েব করা হয়েছে মর্মে টিমের সদস্যদের কাছে প্রতীয়মান হয়। অভিযানকালে অন্যান্য রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২২-২৩ করবর্ষের মাসিক কর নির্ধারণ রেজিস্ট্রার ৪-এর পৃষ্ঠা নম্বর ৩-এর ৪৪ ও ৪৫ নম্বর ক্রমিকে ই-টিআইএনধারী একটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে কর মওকুফ সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

আরও দেখা যায়, ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ করবর্ষের দুটি মামলার বিপরীতে কর্তৃপক্ষের নির্ণয় করা আয়ের বিপরীতে কর দাবির পরিমাণ ছিলো ৭২ কোটি ৯৬ লাখ ৬ হাজার ৮৬২ টাকা ও ৭৩ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার ৯৯০ টাকাসহ মোট ১৪৬ কোটি ৫৭ লাখ ৪৬ হাজার ৫৫৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়। পরে মামলা দুটি এনবিআর অডিটের জন্য নির্বাচিত করে। এর মধ্যে কর নির্ধারণ করা সার্কেল কর্মকর্তা উপকর কমিশনার বদলি হয়ে যায়। নতুন কর্মকর্তা উপকর কমিশনার ওই সার্কেলে যোগদান করেন। পরে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নথিতে রক্ষিত কর নির্ধারণী আদেশ অনুযায়ী কর মামলা দুটিতে করদাবির পরিমাণ নির্ধারণ করেন যথাক্রমে শূন্য টাকা ও ১ হাজার ২৯৯ টাকা, যা অস্বাভাবিক। অর্থাৎ ওই কোম্পানির ২০২০-২১ করবর্ষের ৭২ কোটি ৯৬ লাখ ৬ হাজার ৮৬২ টাকার নির্ধারণ করা হয়ে যায় শূন্য। আর ২০২১-২২ করবর্ষে নির্ধারণ করা কর ৭৩ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার ৯৯০ টাকা হয়ে যায় ১ হাজার ২৯৯ টাকা।

সূত্র আরও জানিয়েছে, অভিযানকালে মোট ১৪৬ কোটি ৫৭ লাখ ৪৬ হাজার ৫৫৩ টাকা কম কর নির্ধারণকারী কর্মকর্তার কর নির্ধারণী আদেশের সংশ্লিষ্ট মূল ফাইলগুলো খুঁজে পাওয়া যায়নি। উদ্দেশ্যমূলকভাবে বা অবৈধ লেনদেনের প্রমাণ থাকায় এসব নথি গায়েব করা হয়েছে মর্মে টিমের নিকট প্রতীয়মান হয়। প্রাপ্ত ব্যাপক অনিয়মের এ তথ্যাবলির আলোকে কমিশনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের জন্য প্রতিবেদন দাখিল করবেন দুদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।

একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, কোম্পানির নাম হলো ধামশুর ইকোনমিক জোন লিমিটেড। এটি আবাসন প্রতিষ্ঠান বেস্ট হোল্ডিংস লিমিটেডের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। পুঁজিবাজার তালিকাভুক্ত বেস্ট হোল্ডিংস লিমিটেড পাঁচ তারকা হোটেল লো মেরিডিয়ানের মালিকানায় রয়েছে। এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে বেস্ট হোল্ডিংস ৫১ শতাংশ শেয়ারের মালিক। ধামশুর ইকোনোমিক জোনের মোট আয়তন আনুমানিক ৮৪৬ একর। এটি ময়মনসিংহের ভালুকায় অবস্থিত। চলতি বছরের জুলাই নাগাদ এই শিল্পাঞ্চলের উন্নয়ন কাজ সমাপ্ত এবং শিল্প-প্লট লিজ দেওয়া শুরু হতে পারে বলে জানা গেছে। বেস্ট হোল্ডিংস লিমিটেড একটি বেসরকারি কোম্পানি যারা বিভিন্ন খাতে ব্যবসা পরিচালনা করে, যার মধ্যে আবাসন, হোটেল এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল উল্লেখযোগ্য। কোম্পানিটি বর্তমানে তিনটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সাথে কাজ করছে। যার মধ্যে রয়েছে-যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্লোবাল হোটেল চেইন ম্যারিয়ট ইন্টারন্যাশনাল এর ব্র্যান্ড লো মেরিডিয়ান, ম্যারিয়ট এবং প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড দ্যা লাক্সারি কালেকশন রিসোর্ট।

** কর্মকর্তা বদলিতে ১৪৬ কোটির কর হলো ‘শূন্য’, নথি গায়েব
** নথি গায়েব করে ১৪৬ কোটি ফাঁকি, আসামি ৩ কর্মকর্তা