গত মঙ্গলবার সড়ক পার হতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন মো. জসীম। নগরের গণি বেকারি মোড়ে একটি অটোরিকশার ধাক্কায় তাঁর ডান হাতের কবজিতে আঘাত লাগে। দুর্ঘটনার পর ওই দিন দুপুরে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। বিকেলে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে বের হওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, সড়কের এক পাশ থেকে অন্য পাশে যাওয়ার সময় হঠাৎ একটি অটোরিকশা এসে ধাক্কা দিলে তিনি আহত হন।
শুধু জসীম নন, মঙ্গলবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জারি ওয়ার্ডে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ৩৮ জন রোগী ভর্তি হন। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, অর্থোপেডিক সার্জারি ওয়ার্ডে শয্যাসংখ্যা সব মিলিয়ে ৮৮ হলেও রোগী থাকে দ্বিগুণের বেশি। আর ভর্তি রোগীর প্রায় অর্ধেক সড়ক দুর্ঘটনার শিকার।
চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের শুরু থেকে ২৫ তারিখ পর্যন্ত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের ২৬ ও ৭৯ নম্বর ওয়ার্ডে অন্তত ৪০০ নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এদের মধ্যে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশই সড়ক দুর্ঘটনায় আহত। পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিকে কেন্দ্র করে দুর্ঘটনায় আহত রোগীর সংখ্যা আরও বেড়েছে। অধিকাংশই মোটরসাইকেল, অটোরিকশা ও প্রাইভেট কার দুর্ঘটনার শিকার। বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ কাওসারুল মতিন জানান, ৮৮টি শয্যা থাকলেও তাদের দেড় থেকে দুই গুণ বেশি রোগীর চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। চট্টগ্রামসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে রোগীরা এখানে আসেন। সড়ক দুর্ঘটনার পাশাপাশি ট্রমা রোগীর চাপও বেশি। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতি সামাল দিতে একটি আলাদা বিশেষায়িত হাসপাতাল জরুরি।
ঈদের ছুটিতে দুর্ঘটনা বেশি
২১ মার্চ দেশে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্যাপিত হয়। ঈদকে ঘিরে ১৭ মার্চ শবে কদরের ছুটিসহ টানা সাত দিন অফিস-আদালত বন্ধ ছিল। এই সময়ের মধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে সাতকানিয়ায় দুজন, পটিয়ায় দুজন এবং মিরসরাই, লোহাগাড়া ও আনোয়ারায় তিনজন রয়েছেন। অধিকাংশ দুর্ঘটনাই ঘটেছে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কার সংশ্লিষ্ট ঘটনায়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য বলছে, এই সাত দিনে হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগে ৩৬০ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৪৯ জনই সড়ক দুর্ঘটনায় আহত। অর্থাৎ মোট রোগীর প্রায় ৪১ শতাংশই দুর্ঘটনাজনিত আঘাতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তবে আঘাত গুরুতর না হলে অনেকেই ক্যাজুয়ালটি বিভাগ থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলায় ৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৪ জন নিহত ও ৯৫ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ঈদের ছুটির সাত দিন (১৭ থেকে ২৩ মার্চ) ঘটেছে ১৬টি দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৬ জন এবং আহত হয়েছেন ৬০ জন। অর্থাৎ মোট নিহতের ৫৯ শতাংশ এবং আহতের ৬৩ শতাংশই ঘটেছে ঈদের ছুটির এই সাত দিনে।
প্রতিদিনই দুর্ঘটনা
ঈদের বন্ধ ছাড়াও চট্টগ্রাম জেলায় মার্চ মাসে প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। কেউ আহত বা নিহত হননি—এমন দুর্ঘটনা থাকলেও সেগুলোর হিসাব বিআরটিএ কিংবা পুলিশের কাছে নেই। পুলিশ বলছে, সাধারণত গুরুতর হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি না হলে অনেকেই থানায় অভিযোগ করেন না। অনেক ঘটনা মীমাংসা হয়ে যায়। এ কারণে দুর্ঘটনার একটি অংশ হিসাবের বাইরে থেকে যায়।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় একটি প্রাইভেট কারের ধাক্কায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দুই যাত্রী নিহত হন। এর আগে মঙ্গলবার লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের নোয়াপাড়া এলাকায় সড়ক পার হওয়ার সময় মোটরসাইকেলের ধাক্কায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। এ ছাড়া বৃহস্পতিবার হাটহাজারীতে বেপরোয়া গতির একটি ট্রাকের চাপায় এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন। একই দিন ভোর সোয়া ৪টার দিকে উপজেলার বানিয়ারছড়া এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে বাসের ধাক্কায় আরও দুই মোটরসাইকেল আরোহীর মৃত্যু হয়। অন্যদিকে, একই দিনে চন্দনাইশে কক্সবাজারগামী একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ধানখেতে পড়ে যায়। এতে বাসটির চালকের সহকারীসহ দুজন আহত হন।
চট্টগ্রামে ঈদ ও ঈদ–পরবর্তী অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের আশপাশে। জানতে চাইলে পটিয়া ক্রসিং হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ বলেন, বেপরোয়া গতি, অসচেতনতা, ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো, সড়কের ত্রুটি ও সার্ভিস লেনের অভাব দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। পাশাপাশি পথচারীদের অনিয়মিত পারাপার ও পদচারী–সেতু ব্যবহার না করায়ও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
