শেয়ারবাজারে পর্যটন ও অবকাশ খাতে তালিকাভুক্ত সি পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা পিএলসির শেয়ার লেনদেনে কারসাজি ও আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কমিশনের তদন্তে যোগসাজশের মাধ্যমে শেয়ার লেনদেনে কারসাজির প্রমাণ পাওয়ায় পাঁচ ব্যক্তি ও চার প্রতিষ্ঠানকে মোট ১ কোটি ৭১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি সহযোগী গোষ্ঠী হিসেবে কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেনে যুক্ত ছিল।
সূত্র জানায়, কারসাজির ঘটনায় প্রগ্রেসিভ হ্যাচারিকে ৮০ লাখ, মরান বিল্ডার্স অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেডকে ২০, অ্যাগ্রো একরসকে ১ এবং হরাইজন হারভেস্টকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া একই ঘটনায় আইন লঙ্ঘনের দায়ে মো. আবু সাদাত মো. সায়েমকে ৩০, মো. পলাশ মিয়াকে ২০, মো. শাহ ইমরান হোসেনকে ৫, মো. হাদায়েতুল হককে ১৩ এবং দেবা সাদাতকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৯ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ১ কোটি ৭১ লাখ টাকা জরিমানা করেছে কমিশন। তদন্ত শেষে সম্প্রতি এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, সি পার্ল বিচ রিসোর্টের শেয়ার নিয়ে কারসাজির অভিযোগ ছিল। বিএসইসির তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে সি পার্ল বিচ রিসোর্টের শেয়ার লেনদেনে সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ মিলেছে। ওই বছরের ২৪ এপ্রিল কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ছিল ৩৬ টাকা ২০ পয়সা। ২৬ জুন তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫ টাকা ৪০ পয়সায়। অর্থাৎ প্রায় দুই মাসের ব্যবধানে শেয়ারটির দাম ১৯ টাকা ২০ পয়সা বা ৫৩ শতাংশ বেড়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, অভিযুক্তরা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর ১৭(ই)(৫) ধারা লঙ্ঘন করে যোগসাজশের মাধ্যমে বিধিবহির্ভূতভাবে মুনাফা হাতিয়ে নিয়েছেন। বিএসইসির তদন্তে এ বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, চারটি পৃথক ঘটনায় সি পার্লের শেয়ার নিয়ে কারসাজি করা হয়েছে। তবে এসব ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে লেনদেনের সময়কালে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে সি পার্লের শেয়ার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে সবপক্ষের ক্ষেত্রেই একই আইনি ধারা লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করেছে কমিশন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদের ডিন অধ্যাপক আল-আমিন বলেন, শুধু জরিমানা করলেই শেয়ারবাজারে শৃঙ্খলা ফিরবে না। জরিমানা কার্যকরভাবে আদায়ের পাশাপাশি অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কারসাজির ঘটনায় শাস্তি কার্যকরে দীর্ঘসূত্রতা হলে বা জরিমানা আদায় না হলে তা অন্যদের জন্য কার্যকর প্রতিরোধ তৈরি করবে না। তিনি আরও বলেন, স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে শাস্তি কার্যকর করা জরুরি। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতি আস্থা বাড়বে এবং বাজারে শৃঙ্খলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ আরও সুগম হবে। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, শেয়ারবাজারে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে তারা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। এ বিষয়ে বিএসইসির এনফোর্সমেন্ট ডিভিশন পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
সি পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা ২০১৯ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। সর্বশেষ তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬) কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৪৮ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪৯ পয়সা। চলতি অর্থবছরের তিন প্রান্তিক মিলিয়ে শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ টাকা ৬৩ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে এ লোকসান ছিল ১ টাকা ৮৫ পয়সা। কয়েক বছর ধরেই কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থা নাজুক। এর মধ্যেও কোম্পানিটির শেয়ার নিয়ে কারসাজির অভিযোগ উঠেছে।
