আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ও ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম মুর্শেদী। তার এনভয় গ্রুপ সংশ্লিষ্ট পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অলিও অ্যাপারেলস লিমিটেড। মুর্শেদী ও অলিও অ্যাপারেলসের বিরুদ্ধে ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালতে মামলা হয়েছে। শ্রমিকের পাওনা ও চাকরি সংক্রান্ত বিরোধে মো. শওকত আলী নামে একজন শ্রমিক এই মামলা দায়ের করেছেন। সম্প্রতি এই মামলা দায়ের করা হয়। মামলার নথিতে শ্রমিকের পাওনা, চাকরিসংক্রান্ত অভিযোগ এবং প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন দাবি তুলে ধরা হয়েছে। অপরদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টি ও উসকানি দেওয়ার অভিযোগে সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আব্দুস সালাম মুর্শেদীর নাম এসেছে। আব্দুস সালাম মুর্শেদীর এনভয় গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে রয়েছেন।
একাধিক সূত্রমতে, আব্দুস সালাম মুর্শেদীর গার্মেন্টস ব্যবসার সঙ্গে তাঁর পরিবারের একাধিক সদস্য জড়িত রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন- স্ত্রী চেয়ারম্যান শারমিন সালাম, পরিচালক হিসেবে মেয়ে ব্যারিস্টার শেরিন সালাম ঐশী এবং ছেলে ইশমাম সালাম। এর আগে এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে কারাবন্দী সাবেক সংসদ সদস্য ও বাফুফের সাবেক সহ-সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী ও তাঁর স্ত্রী সারমিন সালামের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মো. সাব্বির ফয়েজের আদালত এই আদেশ দেন। এছাড়া দুর্নীতি ও জালিয়াতির মাধ্যমে গুলশানে দখল করা অবৈধ বাড়ি নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছেন সালাম মুর্শেদী ও তাঁর পরিবার।
অপরদিকে, শ্রম আদালতে করা মামলার নথিতে বলা হয়েছে, মামলার বাদী মো. শওকত আলী শরীয়তপুর গোসাইরহাট বাংলাবাজার বকশমপট্টি এলাকার পর্বত আলীর ছেলে। মামলায় এনভয় গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, অলিও অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও অলিও অ্যাপারেলসের এজিএম (এইচ আর-এডমিন এন্ড কমপ্লায়েন্স) কে আসামি করা হয়েছে। মো. শওকত আলী ২০২২ সালের ৮ নভেম্বর অলিও অ্যাপারেলস লিমিটেডে ‘লাইন চিফ’ হিসেবে যোগদান করেন। স্থায়ী শ্রমিকের মর্যাদায় সর্বশেষ মাসিক মজুরি ছিলো ৩৬ হাজার ৮৫৩ টাকা (মূল মজুরি ২২ হাজার ৯৩৫) টাকা। তবে শওকত আলীকে গার্মেন্টস কর্তৃপক্ষ স্থায়ী শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দিলেও নিয়োগপত্র দেননি। মো. শওকত আলী চলতি বছরের ১২ আগস্ট পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটি কয়েকমাস বেতন পরিশোধ করেনি। পরে শ্রমিক অসন্তোষ তৈরি হলে কারখানা কর্তৃপক্ষ প্রতিমাসের বেতন ৭ কর্মদিবসের মধ্যে পরিশোধ করবে বলে শ্রমিকদের সঙ্গে চুক্তি হয়। কিন্তু কারখানা কর্তৃপক্ষ গত আগস্ট মাসের বেতন চুক্তি অনুযায়ী পরিশোধ না করে ১০ আগস্ট বিকাল ৫টায় ছুটি দিয়ে দিলে শ্রমিকরা চলে যায়।
১১ আগস্ট কাজ না থাকায় বিকাল ৫টা পর্যন্ত শ্রমিকরা বেতনের জন্য বসে থাকে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ বেতন না দেওয়ায় শ্রমিকরা চলে যায়। ওইদিন সন্ধ্যা ৬টার পর কারখানা কর্তৃপক্ষ মো. শওকত আলীসহ কয়েকজন শ্রমিককে ডেকে শ্রমিকদের বুঝানোর অনুরোধ করেন। সেই মোতাবেক শওকত আলী প্রমিত একরামুল ও ইব্রাহিমকে ১২ আগস্ট শ্রমিকদের কাজে যোগদানের জন্য অনুরোধ করেন। ফলে ১২ আগস্ট সকাল ৯টায় শ্রমিকরা কাজে যোগদান করে কাজ শুরু করেন। কিন্তু সকাল সাড়ে ৯টায় শ্রমিকরা আকস্মিক কাজ বন্ধ করে দেন। এই ঘটনার রেশ ধরে গার্মেন্টস ইনচার্জ আনিস শওকত আলীকে ডেকে নিচে পাঠিয়ে দেন এবং কারখানার জিএম শামীম কোন কারণ ছাড়াই শওকত আলীকে কারখানা থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। শওকত তার কারণ জানতে চাইলে তিনি তাকে সিকিউরিটি ডেকে কারখানা থেকে বের করে দেন। এরপর শওকত কয়েকবার কাজে যোগদান করার জন্য কারখানার প্রবেশ করতে চাইলে সিকিউরিটি গার্ড তাকে ঢুকতে দেয়নি। সিকিউরিটিরা জানিয়ে দেন, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের থেকে নিষেধ আছে।
আরো বলা হয়, শওকত আলী কারখানায় কাজে যোগদানের জন্য কারখানায় প্রবেশ করতে গিয়ে বারবার বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। বাধ্য হয়ে কাজে যোগদানের অনুমতি চেয়ে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে ৬ সেপ্টেম্বর ডাকযোগে চিঠি প্রেরণ করেন। চিঠি পেয়ে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করেন। ১৩ সেপ্টেম্বর চিঠির জবাব দেয় কর্তৃপক্ষ। জবাবে শওকত আলী জানতে পারেন যে, গত ১০ সেপ্টেম্বর পত্রের মাধ্যমে শ্রম আইনের ২৭(এক) ধারা মোতাবেক তাকে চাকরি হতে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, গত ২৩ আগস্ট ও ৩ সেপ্টেম্বর শওকত আলীকে দুইটি চিঠি দিয়ে কাজে যোগদান করতে বলা হয়েছিল। তবে তিনি কোন চিঠি পাননি। কারখানা কর্তৃপক্ষ ষড়যন্ত্র করে অব্যাহতি ও কাজে যোগদানের নাটক সাজিয়েছে। শ্রম আইন লঙ্ঘন করায় প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করা হয়।
