সরকারি জমি দখল করে বহুতল ভবন নির্মান সানভিউর

রাজধানীর মিরপুরে প্রশাসনের চোখের সামনে চলেছে সরকারি জমি দখলের উৎসব। আদালতে মামলা ও রাজউকের উচ্ছেদ অভিযানও থামাতে পারেনি ‘সানভিউ টাওয়ার্স’ নামের এক ডেভেলপার কোম্পানিকে। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের শতকোটি টাকার জমি ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে দখল করে তারা একের পর এক বহুতল ভবন নির্মাণ করছে। অভিযোগ রয়েছে, এই জালিয়াতি আড়াল করতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মূল রেকর্ড বইয়ের পাতাও ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে; এমনকি সরকারি মডেল মসজিদের জন্য নির্ধারিত জায়গাও দখলে নেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব ও সাবেক কর্মকর্তাদের সহায়তায় প্রতিষ্ঠানটি এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে, উচ্ছেদ অভিযানে গিয়ে রাজউক কার্যত দায়সারা ব্যবস্থা নিয়েই ফিরে আসে এবং পরদিনই ঘুষের মাধ্যমে বিষয়টি মিটমাট করা হয়। ফলে জমি উদ্ধারে গেলে সরকারি কর্মকর্তারাই হামলার শিকার হচ্ছেন, আর সাধারণ মানুষের চোখের সামনেই রাষ্ট্রের শতকোটি টাকার সম্পদ বেহাত হয়ে যাচ্ছে।

তথ্য অনুযায়ী, মিরপুরের ৯ নম্বর সেকশনের পল্লবী থানাধীন বাউনিয়া মৌজায় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রায় ১.৬৫ একর জমি দখলে নিয়েছে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান সানভিউ টাওয়ার্স, যেখানে একের পর এক বহুতল ভবন নির্মাণ করে শতকোটি টাকার বাণিজ্য চালানো হচ্ছে। গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ জানায়, সিএস ৩১২৪ ও ৩১২৮ দাগভুক্ত জমিতে একাধিক দখলদার থাকলেও সানভিউ তাদের মধ্যে অন্যতম; সরকারের অধিগৃহীত প্রায় ১৬৮ একর জমির মধ্যে শুধু সিএস ৩১২৪ দাগের প্রায় ৩ একর জমিই তারা বেদখল করেছে। এই অধিগৃহীত জমিকে নিজেদের ক্রয়কৃত দাবি করে ইতোমধ্যে একটি বহুতল ভবন নির্মাণ শেষে ফ্ল্যাট বিক্রি করা হয়েছে এবং স্বপ্ননগর-২ সরকারি প্রকল্পের দেয়াল ঘেঁষে আরেকটি ভবনের নির্মাণকাজও চলছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই এসব ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এ অবস্থায় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ উচ্ছেদ অভিযানের জন্য রাজউককে চিঠি দেয় এবং পল্লবী থানা পুলিশের সহায়তা চাওয়া হয়; তবে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উপস্থিতিতেও অভিযানে মাত্র আংশিক কার্নিশ ভেঙে দায়সারা কার্যক্রম চালিয়ে ফিরে যায় রাজউক। পরে সানভিউ কর্মকর্তাদের সঙ্গে রাজউকের সাক্ষাৎ ও সম্ভাব্য লেনদেনের অভিযোগ ওঠে, যার পর থেকে উচ্ছেদ অভিযানে সংস্থাটির আর তৎপরতা দেখা যায়নি।

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, অধিগৃহীত জমিকে নিজেদের সম্পত্তি দাবি করায় সানভিউ টাওয়ার্সের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা হয়েছে। তবে মামলা চলমান থাকলেও তা উপেক্ষা করে প্রভাব খাটিয়ে নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণ অব্যাহত রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। অভিযোগ রয়েছে, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সংরক্ষিত মূল রেকর্ড বইয়ের যে অংশে সিএস ৩১২৪ দাগের অধিগ্রহণ সংক্রান্ত তথ্য ছিল, তা ছেঁড়া পাওয়া গেছে। অন্যদিকে সানভিউ কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, তারা যে কাগজপত্রের ভিত্তিতে জমির মালিকানা দেখাচ্ছে, সেগুলো জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকেই সংগ্রহ করা। গৃহায়ন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পূর্বে মডেল মসজিদ নির্মাণের জন্য নির্ধারিত জায়গাটিও দখল করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে গৃহায়নের মালিকানাধীন জমি নিজেদের নামে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে সিএস ৩১২৪ ও ৩১২৮ দাগভুক্ত জমির প্রায় ৩ একর দখলে রেখেছে সানভিউ টাওয়ার্স। ২০২৪ সালের অক্টোবরে এসব দখলদার প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিলসহ ব্যবস্থা নিতে রাজউককে চিঠি দিলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, মিরপুরে প্রতি শতাংশ জমির মূল্য ৪৫ লাখ টাকা। সে হিসাবে এক একর জমির সরকারি মূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। সানভিউ প্রায় ৩ একর জমি দখল করেছে। মিরপুরে প্রতি শতাংশ জমির মূল্য জায়গাভেদে কোটি টাকার বেশি। সেই হিসাবে কোম্পানি শতকোটি টাকার সরকারি জমি দখলে নিয়েছে। অবৈধ দখল ও নির্মাণ বন্ধে একাধিক জিডি এবং মামলা হলেও কার্যত কাজ থামেনি। সিএস ৩১২৪ ও সিএস ৩১২৮ দাগের ১৬৮ একর সরকারি জমির প্রায় ২০ একরই দখলে নিয়েছে সানভিউর মতো দখলদার কোম্পানিগুলো। এসব জমি উদ্ধারে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন গৃহায়নের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। জানা গেছে, দখলদার কোম্পানিকে পাকাপোক্ত করতে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং স্থানীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করে জমি দখল করে ব্যবসা করছে সানভিউ। কোম্পানিটির রয়েছে নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনীও। ফলে গৃহায়নের কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জমি উদ্ধারে গেলে হামলার শিকার ও বাধাপ্রাপ্ত হন।

রাজউকের অথরাইজড অফিসার এফ আর আশিক আহমেদ বলেন, ‘জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ আমাদের চিঠি দিয়েছিল অভিযান পরিচালনার জন্য। আমরা নিয়ম অনুযায়ী অভিযান চালাই। কিন্তু সানভিউ টাওয়ার্সের কাছে কাগজপত্র চাইলে তারা বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেনি।’ নামমাত্র অভিযান পরিচালনা করে কেন ফিরে আসলেন—এ প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আমাদের অন্যান্য জায়গায় অভিযান ছিল। দিনভর অভিযান চালিয়েছি। তা ছাড়া অভিযান করা, না করা ডিপেনন্ড করে ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর। এসব অভিযোগের বিষয়ে সানভিউ টাওয়ারের সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘যেখানে আমরা ভবন তুলছি সেই জমি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ নিজেদের দাবি করে; কিন্তু আমরা সাগুফতা কোম্পানির মালিক জুয়েল মোল্লার কাছে থেকে এই জমি কিনেছি।’

সরকারি জমি এবং রাজউকের অনুমোদন ছাড়া বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন—এমন অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের যে অনুমোদন বা নকশা ছিল তার থেকে কিছুটা বেশি করেছি। তাই রাজউক অভিযান চালিয়ে কিছুটা ভেঙেছে। আমাদের কাগজপত্র নিয়ে অভিযানের একদিন পর রাজউকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমরা দেখা করি। ২০২২ সালে সাগুফতা কোম্পানির মাালিক জুয়েল মোল্লার কাছ থেকে এই জমি কিনে সানভিউ কোম্পানি।

জাতীয় গৃহায়নের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হারিজুর রহমান বলেন, ‘সরকারি জমি দখল করে ভবন নির্মাণ করছে একটি কোম্পানি। এই অভিযোগে রাজউককে চিঠি দিয়ে জানানো হয় এবং তারা অভিযান চালায়। মূলত সানভিউ যে জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণ করছে এই জমি গৃহায়নের অধিগ্রহণের জমি। এই জমি নিয়ে মামলা চলছে। মিরপুরে প্রায় ১৬৮ একর জমি অধিগ্রহণ করেছে গৃহায়ন। এই জমি সানভিউ নিজেদের বলে দাবি করছে, যার কোনো ভিত্তি নেই।’

জাতীয় গৃহায়নের চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম বলেন, মিরপুরে সানভিউ কোম্পানি যে জায়গায় বহুতল ভবন নির্মাণ করছে সেই জমি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের। এই জমি নিয়ে মামলা চলছে। কিন্তু মামলা থাকার পরও তার তোয়াক্কা না করে কোম্পানিটি বহুতল ভবন নির্মাণ করছে। সরকারি জমি দখল এবং নকশা-বহির্ভূতভাবে ভবন নির্মাণ করায় সানভিউ কোম্পানির বিরুদ্ধে রাউজককে চিঠি দিয়েছিল জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। পরে তারা অভিযান পরিচালনা করে। সরকারের একবিন্দু জমি কোনো কোম্পানিকে দখল করতে দেওয়া হবে না। আইনগতভাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাজউজকে ফের অভিযান চালানোর জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে।