গত বছর লিচু আবাদে বড় ধরনের লোকসানের পর এ বছর মেহেরপুরের বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা স্বস্তিতে রয়েছেন। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ফলন ভালো হওয়ায় তারা লাভের আশা করছেন, আর বাজারদর অনুকূলে থাকায় বাগানগুলোতেও চলছে জোরদার পরিচর্যা। চলতি সপ্তাহ থেকেই আগাম জাতের আঁটি লিচু বিক্রি শুরু হয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় চাহিদা থাকায় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও উৎসাহ বেড়েছে। জেলার বাগানগুলোতে এখন গাছে গাছে পাকা লিচুর সমারোহ, লাল আভায় ঝলমল করছে রসে ভরা ফল, যেন সারি সারি গাছে লিচুর মেলা বসেছে। পাখির আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে অনেক বাগানে জাল টানানো হয়েছে, আবার কোথাও সনাতন পদ্ধতিতে টিন পিটিয়ে শব্দ করে বাদুড় ও পাখি তাড়ানো হচ্ছে।

বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা জানান, মেহেরপুরের আঁটি লিচুর স্বাদ ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। প্রতিদিন সকাল থেকে শুরু হয় লিচু সংগ্রহের ব্যস্ততা। কেউ গাছের মগডাল থেকে লিচুর ডাল কাটছেন, আবার কেউ সেগুলো সংগ্রহ করে বাছাইয়ের কাজে নিচ্ছেন। দলগতভাবে বাছাই শেষে প্লাস্টিকের ক্যারেটে ভরে বিকেলের মধ্যেই পাঠানো হচ্ছে ঢাকা, বরিশাল, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। তাদের দাবি, গত বছরের তুলনায় এবার ফলন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। একই সঙ্গে বাজারদরও ভালো থাকায় লাভের আশা করছেন তারা।
বাগান ঘুরে জানা গেছে, স্থানীয় আঁটি লিচুর পাশাপাশি এখন উচ্চফলনশীল উন্নত জাতের লিচু চাষের দিকেও ঝুঁকছেন চাষিরা। এর মধ্যে ‘নাইনটি’ জাতের লিচু আকারে বড় এবং টকটকে লাল রঙের হওয়ায় ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। ‘আতা বোম্বাই’ নামের আরেকটি জাতও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, যার আকৃতি ছোট আতার মতো এবং কয়েক বছর ধরে এর চাষ বাড়ছে। মৌসুমের শেষদিকে বাজারে আসে কলম লিচু, যা আকারে বড় ও আকর্ষণীয় হওয়ায় প্রতিটি ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। এছাড়া চায়না থ্রি ও বোম্বাই জাতের লিচুও বাজারে চাহিদাসম্পন্ন। মেহেরপুর শহরের নতুনপাড়ার লিচু ব্যবসায়ী আলতাফ হোসেন জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর লিচুর দাম প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে; বর্তমানে প্রতি কাহন লিচু পাইকারিতে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে ফলন বেশি হওয়ায় তিনি লাভের আশা করছেন।

বাগান মালিক কামাল হোসেন বলেন, ‘মুকুল থেকে গুটি আসার সময়ই অনেক ব্যবসায়ী বাগান কিনে নেন। পরে তারাই পরিচর্যা ও সংগ্রহের কাজ করেন। ফল সংগ্রহ শেষে বাগান মালিকদের টাকা পরিশোধ করা হয়। এতে বাগান মালিক ও ব্যবসায়ী—উভয়েরই লাভ হয়।’ কৃষকদের ভাষ্য, মাঠ ফসলে ধারাবাহিক লোকসানের কারণে অনেকেই এখন ফলবাগান তৈরিতে আগ্রহী হচ্ছেন। বিশেষ করে আঁটি ও কলম লিচুর বিভিন্ন উন্নত জাত চাষ করে লাভের আশা করছেন তারা।
মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সঞ্জিব মৃধা বলেন, ভোক্তাদের জন্য নিরাপদ ফল নিশ্চিত করতে বাগান মালিকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, এ বছর জেলার ৭৩০ হেক্টর জমির লিচুবাগান থেকে প্রায় ছয় হাজার ৮০০ মেট্রিক টন লিচু উৎপাদনের আশা করছে কৃষি বিভাগ।
