দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতে নীরবে কয়েকশ কোটি টাকার অবৈধ টিকিট ও কার্গো বাণিজ্য চলছে। ডজনের বেশি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের স্থানীয় জেনারেল সেলস এজেন্ট (জিএসএ) মাসের পর মাস বৈধ লাইসেন্স ছাড়াই টিকিট বিক্রি ও কার্গো কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) দেওয়া সাময়িক অনুমতির মেয়াদ শেষ হলেও তারা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে, ফলে প্রকাশ্যে আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে এবং সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল নজরদারি ও প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এসব প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে বলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বিমান পরিবহণ খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে লাইসেন্স ছাড়া এ ধরনের কার্যক্রম শুধু বেআইনিই নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং যাত্রীসেবার ক্ষেত্রেও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধ বা মেয়াদোত্তীর্ণ জিএসএ-এর মাধ্যমে টিকিট কেনা কিংবা কার্গো বুকিং করা যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করছে। এতে কোনো ফ্লাইট বাতিল, অর্থ আত্মসাৎ, কার্গো জটিলতা বা প্রতারণার ঘটনা ঘটলে ভুক্তভোগীদের আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ নেই। এছাড়া লাইসেন্সবিহীন জিএসএ-এর মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি ছাড়াও আর্থিক লেনদেনের নামে অর্থ পাচার ও অবৈধ ডলার লেনদেনের শঙ্কা বিরাজ করে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, আন্তর্জাতিক জিএসএ লাইসেন্স শুধু একটি প্রশাসনিক অনুমতি নয়, এটি যাত্রী সুরক্ষা, আর্থিক জবাবদিহি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক কমপ্লায়েন্সের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তার মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যদি তারা টিকিট বিক্রি, কার্গো বুকিং বা বৈদেশিক লেনদেন অব্যাহত রাখে, তবে তা নিয়ন্ত্রক দুর্বলতার স্পষ্ট উদাহরণ। এ পরিস্থিতিতে যাত্রীরা প্রতারণা বা সেবা জটিলতায় পড়লে তাদের আইনি সুরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক টিকিটিংয়ের মাধ্যমে প্রতিদিন বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন হওয়ায় লাইসেন্সবিহীন কার্যক্রম অর্থপাচার প্রতিরোধ ও আর্থিক নজরদারির ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন। তিনি আরও বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি মেয়াদোত্তীর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে পুরো এভিয়েশন খাতে জবাবদিহি প্রশ্নবিদ্ধ হবে। অন্যদিকে নিয়মিত যাত্রী আরাফাত হোসেন বলেন, বিদেশি এয়ারলাইন্সের টিকিট সাধারণত নির্ধারিত এজেন্ট বা জিএসএ-এর মাধ্যমে কেনা হয়, কিন্তু এসব এজেন্টের লাইসেন্স না থাকলে ফ্লাইট বাতিল বা রিফান্ডের ক্ষেত্রে যাত্রীরা অনিশ্চয়তায় পড়তে পারেন; তাই কর্তৃপক্ষের উচিত এ ধরনের অনিয়ম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, যাতে সাধারণ যাত্রীদের নিরাপত্তা ও আস্থা নিশ্চিত থাকে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, বেবিচকের কড়া নির্দেশনা উপেক্ষা করে দেশে লাইসেন্সবিহীন ব্যবসা পরিচালনা করছে ১৬টি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের জেনারেল সেলস এজেন্ট (জিএসএ) প্রতিষ্ঠান। ৩১ মার্চ এসব প্রতিষ্ঠানের সাময়িক অনুমতিপত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। নতুন করে তাদের সঙ্গে কোনো চুক্তি হয়নি। ফলে কোনো বৈধ অনুমোদন ছাড়াই তারা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বেবিচক এর আগে ১৭ ফেব্রুয়ারি এক আদেশে দেশের ১৬টি প্রভাবশালী জিএসএ প্রতিষ্ঠানের অনুমতির মেয়াদ বাড়িয়েছিল। ওই আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল, নিয়মিত নবায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এটি কেবল একটি ‘অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা’। এর কার্যকারিতা সর্বোচ্চ ৩১ মার্চ পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। আদেশের শর্ত অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিয়ে নিয়মিত লাইসেন্স নবায়ন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তা অনুসরণ করেনি। মেয়াদ শেষ হওয়ার দেড় মাস পার হলেও এসব প্রতিষ্ঠানের কেউই বৈধ লাইসেন্স না নিয়ে কোটি কোটি টাকার টিকিট ও কার্গো বাণিজ্য পরিচালনা করে যাচ্ছে।
লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবৈধভাবে যেসব জিএসএ প্রতিষ্ঠান ব্যবসা পরিচালনা করছে, এ তালিকায় রয়েছে সৌদি এরাবিয়ান এয়ারলাইন্সের জিএসএ ইউনাইটেড লিংক লিমিটেড, কাতার এয়ারওয়েজের জিএসএ ওরিক্স এভিয়েশন লিমিটেড এবং ইতিহাদ এয়ারওয়েজের এজেন্ট উইং এভিয়েশন লিমিটেড। এছাড়া ইন্ডিগো ও এয়ার এরাবিয়ার এজেন্ট হিসাবে কাজ করছে আরএএস হলিডেজ ও ওয়ান ওয়ার্ল্ড এভিয়েশন। ক্যাথে প্যাসিফিক এয়ারওয়েজের এজেন্ট হিসাবে গ্লোবাল এভিয়েশন লিমিটেড এবং মালিন্দো (বাটিক এয়ার) এয়ারলাইন্সের এজেন্ট হিসাবে রয়েছে প্রাইম এভিয়েশন লিমিটেড। এ তালিকায় আরও রয়েছে জাজিরা এয়ারওয়েজ, স্পাইসজেট, ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্স এবং ভিয়েতনাম এয়ারলাইন্সের স্থানীয় প্রতিনিধি।
অভিযোগের বিষয়ে লাইসেন্সবিহীন এজেন্টদের বক্তব্য জানতে পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও অনেকেই সাড়া দেননি। দুটি প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে সৌদি এরাবিয়ান এয়ারলাইন্সের জিএসএ ইউনাইটেড লিংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ ইউসুফ ওয়ালিদ বলেন, আমরা অনেকদিন আগেই লাইসেন্স নবায়নের জন্য আবেদন করেছি। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে আমাদের লাইসেন্স নবায়ন করা হচ্ছে না। আমরা নিয়মিত বেবিচকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি।
ইতিহাদ এয়ারওয়েজের জিএসএ এজেন্ট উইং এভিয়েশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব আনাম বলেন, বিষয়টি তিনি পুরোপুরি দেখভাল করেন না এবং খোঁজ নিয়ে পরে জানাবেন। অন্যদিকে বেবিচকের আদেশের ২(ঘ) ধারায় উল্লেখ রয়েছে, তারা কোনো কারণ না দেখিয়েই জিএসএ-এর বর্ধিত মেয়াদ বাতিল বা সংশোধন করার ক্ষমতা রাখে। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় অনিয়মের প্রশ্ন উঠছে। একই আদেশের ২(খ) শর্ত অনুযায়ী মূল অনুমোদনের সব শর্ত কঠোরভাবে মানার বাধ্যবাধকতা থাকলেও মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় ব্যবসা পরিচালনা করা লাইসেন্সিং বিধিমালার সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ বিষয়ে বেবিচকের সদস্য (ফ্লাইট সেফটি অ্যান্ড রেগুলেশন) এয়ার কমোডর মুকিত উল আলম মিয়া বলেন, কিছু প্রশাসনিক জটিলতার কারণে লাইসেন্স নবায়ন প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হচ্ছে, তবে বিষয়টি দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং শিগগিরই এ জটিলতা কেটে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে; পাশাপাশি তিনি বলেন, লাইসেন্স ছাড়া অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনার কোনো সুযোগ নেই।
