দেশের প্রধান রাজস্ব আদায়কারী সংস্থা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) রেকর্ড পরিমাণ ঘাটতির মুখে পড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে শুল্ক–কর আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা, যা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ। এর আগে গত অর্থবছরে পুরো বছরে এনবিআরের ঘাটতি ছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা, যা তখন রেকর্ড ছিল। তবে চলতি অর্থবছরের মাত্র ৯ মাসেই সেই পরিমাণ ছাড়িয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) রাজস্ব আদায় বাড়ানোর শর্ত দিলেও সেই লক্ষ্য পূরণে বড় চাপে পড়েছে এনবিআর। বিপুল ঘাটতির মধ্যে অর্থবছরের বাকি সময়ে লক্ষ্য অর্জন করতে হলে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা কর আদায় করতে হবে সংস্থাটিকে। এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের পর বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে, যাদের জন্য শুল্ক–কর আদায় বাড়ানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া রাজস্ব খাতের সংস্কার উদ্যোগগুলোও এখন অনিশ্চয়তায় রয়েছে। এনবিআর বিলুপ্ত করার যে অধ্যাদেশটি আনা হয়েছিল, সেটিও নতুন সরকার জাতীয় সংসদে পাসের জন্য উত্থাপন করেনি।
বিশাল রাজস্ব আদায়ের চ্যালেঞ্জ নতুন সরকারের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে। বাজেটের মাধ্যমে সরকারের খরচের চাপ ক্রমশ বাড়ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে সরকারের আয় বাড়ানোর বিকল্প নেই। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য সংকট, তেলের দাম বৃদ্ধিসহ নানামুখী সংকটের মধ্যে আছে ব্যবসা–বাণিজ্য। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত আছে। সংস্থাটি ৪৭০ কোটি টাকার ঋণের শর্ত হিসেবে প্রতিবছর জিডিপির আধা শতাংশের বেশি অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের শর্ত দিয়েছে। এ ছাড়া সরকারের উন্নয়ন খরচ বাদে পুরো খরচই অভ্যন্তরীণ রাজস্ব দিতে হয়।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত রাজস্ব খাত সংস্কার কমিটির প্রধান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, বর্তমান রাজস্ব প্রশাসন দিয়ে এত বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন। তাই রাজস্ব খাতের সংস্কারের বিকল্প নেই, যা এই পর্যন্ত কোনো সরকারই ব্যাপকভাবে করেনি। আবদুল মজিদ আরও বলেন, ‘এখন এনবিআর নীতি প্রণয়ন করে, আবার শুল্ক–কর আদায়ও করে। তাই তাদের জবাবহিদি নিশ্চিত করা যাচ্ছিল না। শুল্ক–কর কর্মকর্তাদের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ আছে।’
ঘাটতি ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা
চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই–মার্চ) শুল্ক–কর আদায়ে ঘাটতি ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। আজ মঙ্গলবার এনবিআর রাজস্ব আদায়ের হালনাগাদ চিত্র প্রকাশ করেছে। জুলাই-মার্চ সময়ে আমদানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) ও আয়কর—এই তিন খাতের মধ্যে কোনো খাতেই লক্ষ্য অর্জন হয়নি। গত ৯ মাসে এনবিআর সব মিলিয়ে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা আদায় করেছে। লক্ষ্য ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। তবে শুল্ক–কর আদায়ে প্রবৃদ্ধি প্রায় ১১ শতাংশ।
আলোচ্য সময়ে সবচেয়ে বড় ঘাটতি দেখা গেছে আয়কর খাতে, যেখানে ৯ মাসে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৪০ হাজার কোটি টাকা। আমদানি খাতে ঘাটতি হয়েছে ২২ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা এবং জুলাই-মার্চ সময়ে ভ্যাট বা মূসক আদায়ে ঘাটতি রয়েছে ৩৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এনবিআরের কর্মকর্তাদের মতে, ব্যবসা-বাণিজ্যের শ্লথগতির কারণে রাজস্ব আদায় প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়নি। এ পরিস্থিতিতে করের আওতা বাড়ানো, কর পরিপালন নিশ্চিত করা, কর ফাঁকি রোধ এবং ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব পুনরুদ্ধারে কাজ করছে সংস্থাটি। সংশোধিত বাজেট অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে এনবিআরকে মোট ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য পূরণ করতে হবে।
চ্যালেঞ্জ কী কী
নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে আগামী তিন মাসে বিপুল পরিমাণ শুল্ক–কর আদায়। এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে মোট ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করতে হবে, যা অর্জনে প্রতি মাসে গড়ে ৭১ হাজার ৭১২ কোটি টাকা আদায় প্রয়োজন। তবে এত বড় অঙ্কের রাজস্ব সংগ্রহ সহজ নয়, কারণ চলতি অর্থবছরের কোনো মাসেই এত রাজস্ব আদায় হয়নি। সর্বোচ্চ আদায় হয়েছে জানুয়ারিতে ৩৭ হাজার ৩৩ কোটি টাকা, আর সর্বনিম্ন আগস্টে ২৭ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা। এ ছাড়া রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি স্বাভাবিক করাও বড় চ্যালেঞ্জ। মধ্যপ্রাচ্য সংকট, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য শ্লথ হয়ে পড়েছে, আমদানি কমেছে এবং নতুন বিনিয়োগও তেমন আকৃষ্ট হচ্ছে না। ফলে প্রত্যাশিত হারে রাজস্ব আদায় সম্ভব হচ্ছে না।
পুরোনো রাজস্ব প্রশাসন কাঠামো দিয়ে এত বড় লক্ষ্য অর্জন কঠিন—এ কথা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। এ লক্ষ্য পূরণে সংস্কার জরুরি হলেও অন্তর্বর্তী সরকার যে অধ্যাদেশ জারি করেছিল, তা বিএনপি সরকার বিল আকারে জাতীয় সংসদে উপস্থাপন না করায় কার্যকারিতা হারিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে সরকার রাজস্ব খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ‘অরাজনৈতিক’ সংস্কারেও পিছিয়ে পড়ছে, যদিও দেশের অর্থনীতির জন্য এ সংস্কার অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। একই সঙ্গে আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী রাজস্ব খাত সংস্কারের বিষয়টিও থমকে গেছে, ফলে ঋণের কিস্তি পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে উঠছে এবং বিদেশি উৎস থেকে অর্থপ্রাপ্তিও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে কর–জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, কর ফাঁকি রোধ, করজালের বাইরে থাকা করযোগ্য জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করা, রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ঘুষ–দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার মতো পুরোনো সমস্যাগুলোর সমাধানে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
