দেশে কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএনধারীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ। অথচ গত অর্থবছরে আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন প্রায় ৫০ লাখ করদাতা। অর্থাৎ, প্রায় ৮০ লাখ টিআইএনধারী রিটার্ন জমা দেননি। তাঁদের মধ্যে কতজন মারা গেছেন, কতজনের করযোগ্য আয় নেই এবং কতজন ইচ্ছাকৃতভাবে রিটার্ন দিচ্ছেন না, সে বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। এ পরিস্থিতিতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জনে প্রকৃত করদাতা শনাক্ত করা এবং রিটার্ন দাখিলের হার বাড়ানো সংস্থাটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রকৃত করদাতা শনাক্ত করার পাশাপাশি মৃত ও নিষ্ক্রিয় টিআইএনধারীদের চিহ্নিত করে রিটার্ন জমার হার বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর। রিটার্ন না দেওয়া করদাতাদের ঠিকানায় চিঠি পাঠানোর পাশাপাশি মৃত টিআইএনধারীদের তথ্য সংগ্রহে জাতীয় নির্বাচন কমিশন (ইসি) এবং জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য চাওয়ার পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি। এনবিআরের কর্মকর্তাদের ধারণা, রিটার্ন জমা না দেওয়া ব্যক্তিদের একটি অংশ মারা গেছেন। আবার অনেকে বিশেষ প্রয়োজনে টিআইএন নিলেও বর্তমানে তাঁদের করযোগ্য আয় নেই। ফলে প্রকৃত করদাতা ও নিষ্ক্রিয় টিআইএনধারীদের আলাদা করা এবং করজালের কার্যকারিতা বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে।
রিটার্ন জমা না দেওয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করে প্রতিটি কর অঞ্চল থেকে চিঠি পাঠানো হচ্ছে। তবে করদাতাদের ঠিকানা ভুল কিংবা হালনাগাদ না থাকায় পাঠানো চিঠির প্রায় ৪০ শতাংশ ফেরত আসছে। বিপরীতে জবাব দিচ্ছেন মাত্র ১০ শতাংশ করদাতা। জনবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সংকটেও নজরদারি বাড়ানো যাচ্ছে না। পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, করজাল সম্প্রসারণের পাশাপাশি রিটার্ন দাখিলের কার্যকারিতা বাড়াতে হবে। মৃত ব্যক্তিদের নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার তৈরি এবং এনবিআরের বিদ্যমান তথ্যভান্ডার হালনাগাদ করা জরুরি।
দীর্ঘদিন ধরে রিটার্ন জমা না দেওয়া টিআইএনধারীদের মধ্যে মৃত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে ইসির কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে মৃত্যুর কারণে বাদ পড়া ব্যক্তিদের তথ্যের সঙ্গে এনবিআরের টিআইএন তথ্যভান্ডার মিলিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি। এসব তথ্যের ভিত্তিতে মৃত ব্যক্তিদের টিআইএন চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বর্তমানে মৃত ব্যক্তি কিংবা অপ্রয়োজনীয় টিআইএন অনলাইনে সরাসরি বাতিলের ব্যবস্থা নেই। মৃত ব্যক্তির টিআইএন বাতিল করতে তাঁর উত্তরাধিকারীকে সংশ্লিষ্ট কর অফিস বা সার্কেলে আবেদন করতে হয়। ফলে মৃত ব্যক্তিদের সমন্বিত তথ্যভান্ডার না থাকায় তাঁদের টিআইএন শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করার কাজেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
মৃত ব্যক্তিদের পাশাপাশি রিটার্ন না দেওয়া নিষ্ক্রিয় টিআইএনধারীদের শনাক্ত করতেও কর অঞ্চলগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে ঠিকানা ও যোগাযোগের তথ্য হালনাগাদ না থাকায় প্রত্যাশিত সাড়া মিলছে না। এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, বিপুলসংখ্যক টিআইএনধারী থাকলেও তাঁদের সবাইকে কার্যকর করজালের আওতায় আনা যাচ্ছে না। আবার অনেক করদাতা রিটার্ন জমা দিলেও শূন্য রিটার্ন দিচ্ছেন।
কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া মনে করেন, যাঁদের টিআইএন রয়েছে, তাঁদের রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা কার্যকরভাবে নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে যেসব ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র বাধ্যতামূলক, সেখানে নিয়মটির যথাযথ প্রয়োগ প্রয়োজন। পাশাপাশি করদাতাদের রিটার্ন দিতে উৎসাহিত করতে করব্যবস্থা সহজ করা এবং যৌক্তিক কর-সুবিধা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। চলতি অর্থবছরে আয়কর খাত থেকে ২ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এনবিআর। তবে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত এ খাতে আদায় হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা।
