রপ্তানি প্রণোদনায় কর কাঠামো বদলে বাড়ছে চাপ

দেশের রপ্তানি আয় বাড়াতে সরকারের দেওয়া প্রণোদনার ওপর উৎসে কর কিছুটা কমানো হলেও রপ্তানিকারকরা এখন প্রায় সাড়ে ২৭ শতাংশ করের ঝুঁকিতে পড়েছেন। নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আয়কর আইনের ন্যূনতম করের বিধান থেকে বেরিয়ে আসার প্রস্তাব থাকায় এ বাড়তি করের চাপ সৃষ্টি হতে পারে। গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অর্থবিল ২০২৬-এ আয়কর আইনের ১৬৩ ধারায় সংশোধন আনার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা পাস হলে ন্যূনতম করের বিধান বাতিল হয়ে যাবে।

এর ফলে সঞ্চয়পত্র থেকে শুরু করে রপ্তানি পণ্যের প্রণোদনা পর্যন্ত সব আয়ই, মোট আয় হিসেবে বিবেচনা করা হবে। সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে করমুক্ত আয় ও প্রথম করের ধাপ ১০ শতাংশ হওয়ায় সীমিত আয়ের মানুষ কিছুটা সুফল পাবেন, কিন্তু রপ্তানি প্রণোদনায় এমন কোনো করহার বা ধাপ না থাকায় পুরো আয়ের ওপরই রপ্তানিকারককে সাড়ে ২৭ শতাংশ কর দিতে হবে। বর্তমানে রপ্তানি খাতের প্রণোদনায় উৎসে কর একজন করদাতার ন্যূনতম কর হিসেবে চূড়ান্ত কর বা করদায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

আইন অনুযায়ী, রপ্তানি প্রণোদনার বিপরীতে ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কেটে রাখার বিধান রয়েছে; এটি কাটার পর করদাতাকে এর জন্য আর কর দিতে হতো না। এটিই আইনের ভাষায় ন্যূনতম কর হিসেবে চূড়ান্ত কর বা করদায়। আগামী করবর্ষের জন্য উৎসে কর নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ শতাংশ। অর্ধেক কমে যাওয়ার বিষয়টি দৃশ্যমান হলেও আয়করের নতুন বিধান অনুযায়ী উৎসে কর অগ্রিম আয়কর হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ রপ্তানিকারকের প্রণোদনা আয়ের ওপর যে পরিমাণ কর প্রযোজ্য তার থেকে ৫ শতাংশ বাদ দেওয়ার পরে বাকি কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে যাচ্ছে।
NBR Bhaban
আয়কর আইনে এ অর্থকে সরাসরি রপ্তানি আয় হিসেবে নয়, বরং রপ্তানি প্রণোদনা থেকে অর্জিত আয় হিসেবে গণ্য করা হয়, যেখানে সাধারণ আয়ের মতোই প্রায় সাড়ে ২৭ শতাংশ করপোরেট করহার প্রযোজ্য। উদাহরণস্বরূপ, বর্তমানে কোনো রপ্তানিকারক এক কোটি টাকা প্রণোদনা পেলে এর ওপর ১০ শতাংশ হারে ১০ লাখ টাকা উৎসে কর কাটা হয়, যা ন্যূনতম কর হিসেবে বিবেচিত। তবে নতুন বিধান কার্যকর হলে একই অঙ্কের প্রণোদনায় উৎসে কর কমে ৫ লাখ টাকা অগ্রিম আয়কর হিসেবে কাটা হবে, আর বাকি প্রায় সাড়ে ২২ লাখ টাকা অতিরিক্ত কর হিসেবে পরিশোধ করতে হবে—ফলে মোট করভার দাঁড়াবে প্রায় সাড়ে ২৭ শতাংশ।

এ বিষয়ে এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস এর পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, দেখুন, এমনিতেই গার্মেন্টসের অবস্থা খারাপ। অনেকদিন টানা কমে যাচ্ছে রপ্তানি। এরমধ্যে রপ্তানিকারকদের এই মুহূর্তে দাবি ছিল উৎসে করটা কমিয়ে দেওয়া। তো উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ করা হয়েছে, এটা ঠিক আছে। কিন্তু দিনশেষে আপনি যখন চূড়ান্ত কর থেকে বেরিয়ে এসেছেন, এটাকে ‘স্ট্যান্ডার্ড রেটে’ নিয়ে আসবেন, তখন তাদের ওপরও বোঝাটা থাকবেই। অর্থাৎ আপনি রপ্তানির জন্য একটা প্রণোদনা পাচ্ছেন, তার ওপরে এখন সাড়ে ২৭ শতাংশ কর দিতে হবে।

সাড়ে ২৭ শতাংশ কর আরোপের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে করনীতি বিশ্লেষক বলেন, রপ্তানিকারকদের জন্য ১০ বা ১২ শতাংশ করপোরেট করহার নির্ধারিত হলেও তা কেবল প্রকৃত রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু প্রণোদনা থেকে পাওয়া অর্থকে রপ্তানি আয় হিসেবে ধরা হয় না; আয়কর আইন অনুযায়ী এটি সাধারণ আয়ের আওতায় পড়ে এবং ‘স্ট্যান্ডার্ড রেটে’ কর দিতে হয়। ফলে করের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। তিনি আরও বলেন, ন্যূনতম কর ব্যবস্থার বাইরে যাওয়ার দাবি থাকলেও কোনো খাতকে এর বাইরে নেওয়ার আগে সম্ভাব্য প্রভাব বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি। তার মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট খাতের অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা এবং একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ইমপ্যাক্ট স্টাডি’ করা উচিত ছিল, যাতে শিল্পের ওপর এর প্রকৃত প্রভাব বোঝা যায়।

একই সঙ্গে এ সিদ্ধান্ত চলতি অর্থবছরের আয়ের ওপর করায় রপ্তানিকারকদের ওপর ‘রেট্রোস্পেক্টিভ’ প্রভাব পড়বে বলেও তিনি তুলে ধরেন। এই বিশ্লেষক বলেন, যারা বছরান্তে হিসাব করে থাকে তারা ২০২৫ এর শেষেই তাদের প্রথম ছয়মাসের হিসাব-নিকাশ শেষ করে ফেলেছে; আর যারা জুনে তাদের ব্যবসার হিসাব করে, তাদের হাতে রয়েছে আর মাত্র পনের দিন। এ সময় সরকারের এ সিদ্ধান্ত তাদের ওপর নেতিবাচক চাপ তৈরি করবে।