বেক্সিমকো শিল্পপার্কের ১৪টি লে-অফ প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক ও কর্মচারীদের বকেয়া পরিশোধে সরকার ৫২৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা দিচ্ছে। এই অর্থ কোম্পানিটিকে ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে, যা পরে বেক্সিমকো গ্রুপকে পরিশোধ করতে হবে। মোট পাওনাদারের মধ্যে রয়েছেন ৩১ হাজার ৬৭৯ জন শ্রমিক এবং ১ হাজার ৫৬৫ জন কর্মচারী। আগামী ৯ মার্চ থেকে ধাপে ধাপে এই পাওনা পরিশোধ শুরু হবে, যা রমজানের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলবে। সচিবালয়ে বৃহস্পতিবার ( ২৭ ফেব্রুয়ারি ) বেক্সিমকো শিল্পপার্কের প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রম ও ব্যবসায় পরিস্থিতি পর্যালোচনা–সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির বৈঠক শেষে শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন এসব তথ্য জানান।
এ সময় আরও জানানো হয়, শুক্রবার ( ২৮ ফেব্রুয়ারি ) থেকে বেক্সিমকো শিল্পপার্কের ১৪টি প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করা হবে। বন্ধ এসব প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের পাওনা পরিশোধে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ দেবে ৩২৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। বাকি ২০০ কোটি টাকা নেওয়া হবে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কেন্দ্রীয় তহবিল থেকে। ৯ মার্চ থেকে বেক্সিমকো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শ্রমিক-কর্মচারীদের পাওনা পরিশোধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
বেক্সিমকো শিল্পপার্কের প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে সাংবাদিকদের জানানো হয়েছে। ছয় সদস্যবিশিষ্ট এই কমিটির নেতৃত্ব দেবেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়সংক্রান্ত বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী। কমিটিতে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে একজন করে প্রতিনিধি থাকবেন। এছাড়া, বেক্সিমকো লিমিটেডে নিযুক্ত রিসিভার এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান, যিনি সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।
বেক্সিমকো শিল্পপার্কের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ২০০৮-২০২৪ সময়ে জনতা ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ দেওয়া হয়েছে। অনিয়মের ভিত্তিতে এসব ঋণ দেওয়ার জন্য ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসির কর্মকর্তাদেরও দায় আছে। এসব কথা উল্লেখ করে শ্রম উপদেষ্টা জানান, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আর ঋণ দেওয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা যেন দেশের বাইরে যেতে না পারেন, সে জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
গত ৫ আগস্ট সরকার বদলের পর বেক্সিমকো গ্রুপের অন্যতম কর্ণধার ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান গত ১৩ আগস্ট থেকে কারাগারে রয়েছেন। ২৯ আগস্ট সালমান এফ রহমান, তাঁর ছেলে আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমান, পুত্রবধূ শাজরেহ রহমানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শুরুতে বেক্সিমকো গ্রুপের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বিক্রি করে শ্রমিকদের পাওনা মেটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সাখাওয়াত হোসেনের নেতৃত্বাধীন উপদেষ্টা কমিটি। পরে শেয়ার বিক্রিতে জটিলতা দেখা দেওয়ায় সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের সিদ্ধান্ত হয়।
শ্রম উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা কোনো শ্রমিকের বিরুদ্ধে না। কোনো শ্রমিকের চাকরি চলে যাক, তা আমরা চাই না। কারণ, তাঁদেরও পরিবার আছে।’ বেক্সিমকোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এমন কিছু করবেন না, যাতে সরকারকে কঠোর হতে হয় এমন হুঁশিয়ারও করেন তিনি।
উপদেষ্টা কমিটির সিদ্ধান্তের আগেই বুধবার ( ২৬ ফেব্রুয়ারি ) বেক্সিমকো গ্রুপ ১৪টি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধের ঘোষণা দেয়। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, কাজের অভাবের কারণে এসব প্রতিষ্ঠান ১৬ ডিসেম্বর থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত লে-অফ করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে কাজের কোনো ব্যবস্থা না হওয়ায় শুক্রবার ( ২৮ ফেব্রুয়ারি ) থেকে কারখানাগুলোর কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি, শ্রম আইন অনুসরণ করে কর্মীদের ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্তের কথাও বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।