বিলাসবহুল গাড়িতে বাড়ছে অগ্রিম আয়কর

২০২৬-২৭ অর্থবছর

বাজেট সাধারণত নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের ব্যয়ের হিসাব নতুন করে সাজায়। তবে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এবার ধনীরাও করের আওতার বাইরে থাকছেন না। সাড়ে তিন হাজার সিসির বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে আগে যেখানে দুই লাখ টাকা অগ্রিম আয়কর দিতে হতো, সেখানে এবার তা বাড়িয়ে পাঁচ লাখ টাকা নির্ধারণের পরিকল্পনা করছে সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। সূত্র আরও জানায়, বর্তমানে সাড়ে তিন হাজার সিসির একটি গাড়ির জন্য দুই লাখ টাকা অগ্রিম আয়কর প্রযোজ্য রয়েছে।

এই হার বাড়লে করের পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে। একাধিক গাড়ি থাকলে প্রতিটি গাড়ির জন্য বর্তমানে তিন লাখ টাকা কর দিতে হয়। তবে আসন্ন বাজেটে একটি গাড়ির ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর পাঁচ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। একাধিক গাড়ির ক্ষেত্রে এই কর বাড়িয়ে সাত লাখ ৫০ হাজার টাকা করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। রিটার্ন জমার প্রমাণ উপস্থাপন করতে না পারলে করের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে জানা গেছে। জানা যায়, দেশের বাজারে সাড়ে তিন হাজার সিসির বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন গাড়িকে বিলাসবহুল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ক্ষেত্রবিশেষে এসব গাড়ির দাম ১০ কোটি টাকারও বেশি হয়ে থাকে। এসব গাড়ির মধ্যে টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার, বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ বেঞ্জ, পোরশে ও ল্যান্ড রোভার অন্যতম। বর্তমানে তিন হাজার সিসির বেশি কিন্তু সাড়ে তিন হাজার সিসির কম ক্ষমতাসম্পন্ন গাড়ির ক্ষেত্রে বছরে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর নির্ধারিত রয়েছে।

আগামী বাজেটে এই হার বাড়িয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত করা হতে পারে। আড়াই হাজার সিসির বেশি কিন্তু তিন হাজার সিসির কম ক্ষমতাসম্পন্ন গাড়ির ক্ষেত্রে বর্তমানে বছরে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর নির্ধারিত রয়েছে, যা আগামী বাজেটে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে। দুই হাজার সিসির বেশি কিন্তু আড়াই হাজার সিসির কম ক্ষমতাসম্পন্ন গাড়ির ক্ষেত্রে বর্তমানে বছরে ৭৫ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর নির্ধারিত আছে, যা বাড়িয়ে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। একইভাবে এক হাজার ৫০০ সিসির বেশি কিন্তু দুই হাজার সিসির কম গাড়ির ক্ষেত্রে বর্তমানে ৫০ হাজার টাকা এবং এক হাজার ৫০০ সিসির মধ্যে থাকা গাড়ির ক্ষেত্রে ২৫ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর দিতে হয়। এই দুই শ্রেণির গাড়ি সাধারণত মধ্যবিত্ত ব্যবহার করায় এ খাতে করহার অপরিবর্তিত থাকবে বলে জানা গেছে।

বিলাসী গাড়ির করহার বাড়ালে রাজস্ব আদায়ে কেমন প্রভাব পড়তে পারে—এ বিষয়ে এনবিআরের কোনো গবেষণা নেই। তবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) এক সভায় বলা হয়েছে, দেশের সড়কে বর্তমানে অন্তত আড়াই লাখ নিবন্ধনহীন গাড়ি চলাচল করছে। এতে সরকার প্রতিবছর অন্তত ছয় হাজার ২৫০ কোটি টাকা আয়কর হারাচ্ছে। বিআরটিএ সূত্র বলছে, বাস, মিনিবাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কারসহ বিভিন্ন ধরনের গাড়ির সমন্বয়ে বর্তমানে দেশের নিবন্ধিত মোট যানবাহনের সংখ্যা ৬৭ লাখ ২৪ হাজার ৬৪৭টি।

এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) সম্প্রতি ৫ হাজার ৪৮৯টি বিলাসবহুল গাড়ির কর নথি যাচাই করেছে। যাচাইয়ে দেখা যায়, ১ হাজার ৩৩৯ জন গাড়ির মালিক তাঁদের তথ্য গোপন করে কর ফাঁকি দিয়েছেন। এতে এসব গাড়ি থেকে এক হাজার কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে বলে কর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। টয়োটা, বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ, পোরশে, বেন্টলি, রোলস-রয়েস ও টেসলার মতো ব্র্যান্ডের গাড়িও এই তালিকায় রয়েছে। কর আদায় বাড়ানো ও কর ফাঁকি রোধে এনবিআর আরও কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংস্থাটির এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, ধনী ব্যক্তিদের বিভিন্ন কৌশলে কর ফাঁকির প্রবণতা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে হারানো রাজস্ব পুনরুদ্ধার, নিয়মিত কর আদায় বৃদ্ধি এবং কর ফাঁকি নিরুৎসাহিত করতে আসন্ন বাজেটে নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

অগ্রিম আয়কর ছাড়াও একাধিক গাড়ির ক্ষেত্রে বর্তমানে সাড়ে তিন হাজার সিসির বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন গাড়িতে বছরে তিন লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিবেশ সারচার্জ দিতে হয়। তিন হাজার সিসির বেশি কিন্তু সাড়ে তিন হাজার সিসির কম ক্ষমতাসম্পন্ন গাড়ির ক্ষেত্রে এই সারচার্জ দুই লাখ টাকা। আড়াই হাজার সিসির বেশি কিন্তু তিন হাজার সিসির কম ক্ষমতাসম্পন্ন গাড়ির ক্ষেত্রে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা, আর দুই হাজার সিসির বেশি কিন্তু আড়াই হাজার সিসির কম ক্ষমতাসম্পন্ন গাড়ির ক্ষেত্রে ৭৫ হাজার টাকা সারচার্জ নির্ধারিত আছে। এক হাজার ৫০০ সিসির বেশি কিন্তু দুই হাজার সিসির কম গাড়ির জন্য ৫০ হাজার টাকা এবং এক হাজার ৫০০ সিসির মধ্যে থাকা গাড়ির ক্ষেত্রে ২৫ হাজার টাকা সারচার্জ দিতে হয়। জানা গেছে, আগামী বাজেটে এই সারচার্জের পরিবর্তে সম্পদ কর আরোপের প্রস্তাব আসতে পারে।