গ্রামের অর্ধেক পরিবারে ফ্রিজ ব্যবহার করে

বিবিএসের জরিপ

এক দশক আগেও রেফ্রিজারেটর বা ফ্রিজ ছিল দেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের জন্য এক ধরনের বিলাসী পণ্য। তখন বাজারটি ছিল আমদানিনির্ভর। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। শতভাগ বিদ্যুতায়ন, সাশ্রয়ী মূল্য এবং প্রযুক্তির স্থানীয়করণের ফলে দেশের রেফ্রিজারেটর শিল্প এখন বছরে প্রায় ১১ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকার একটি শক্তিশালী ও স্বনির্ভর উৎপাদন খাতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে দেশের অর্ধেকের বেশি পরিবারে ফ্রিজ ব্যবহৃত হচ্ছে। শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও ফ্রিজের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে এবং বিক্রির প্রবৃদ্ধি বেশি দেখা যাচ্ছে গ্রামেই। দেশের মোট চাহিদার ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ এখন দেশীয় কোম্পানিগুলোর কারখানায় উৎপাদিত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, দেশে তৈরি ফ্রিজ এখন আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানি করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও শিল্প খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যানুযায়ী, দেশে ফ্রিজের বার্ষিক চাহিদা এখন ২৫ থেকে ৩৫ লাখ ইউনিট এবং বাজারটি বছরে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সর্বশেষ গৃহস্থালি ও স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস জরিপে দেখা গেছে, বর্তমানে ৫৩.৪ শতাংশ পরিবারের নিজস্ব রেফ্রিজারেটর রয়েছে, যা ২০২১ সালে ছিল ৪৫ শতাংশ। এই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি গ্রামাঞ্চল, যেখানে বিদ্যুতায়নের সম্প্রসারণ ও দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোর ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে সাশ্রয়ী ও আধুনিক ফ্রিজ সরবরাহের কারণে ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে; শহরে ৭০ শতাংশ পরিবার ফ্রিজ ব্যবহার করলেও গ্রামে তা বেড়ে ৪৮ শতাংশে পৌঁছেছে। বাজারের এই সম্প্রসারণকে কেন্দ্র করে উদ্যোক্তারা উৎপাদনে জোর দিচ্ছেন, ফলে ফ্রিজের ক্যাবিনেট, মোল্ডিং, শিট মেটাল, গ্লাস ডোর ও প্লাস্টিকসহ প্রায় সব উপাদান এখন দেশেই তৈরি হচ্ছে এবং শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ গড়ে উঠছে।

ইলক্ট্রো মার্ট গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরচিালক মো. নুরুল আফছার বলেন, দেশের ফ্রিজের বাজারে বর্তমানে স্থানীয় উৎপাদনকারীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিযোগিতা রয়েছে। ক্রেতাদের পছন্দসই ফ্রিজ দিতে সবাই গুণ ও মানের তৈরিতে প্রধান্য দিচ্ছে। তা ছাড়া মান বিবেচনায় দেশে তৈরি ফ্রিজ এবং বিদেশে তৈরি ফ্রিজ একই; বরং দামে সাশ্রয়ী হওয়ায় দেশি কোম্পানির তৈরি ফ্রিজ ৯০ শতাংশের বেশি বিক্রি হচ্ছে। নুরুল আফছার বলেন, দেশীয় শিল্পের সোনালি সম্ভাবনার মাঝেও কিছু বড় চ্যালেঞ্জের মেঘ জমছে। দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ সফল বাস্তবায়নে এ খাতের বিকাশ এবং কর্মসংস্থানের বড় ক্ষেত্র ধরে রাখতে বিদ্যমান করসুবিধার মেয়াদ ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বাড়ানো উচিত। কাঁচামাল আমদানি পর্যায়ের উচ্চ ভ্যাট না নিয়ে বিক্রি পর্যায়ে নেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, নীতির ধারাবাহিকতা ও কর সহায়তা বজায় থাকলে এই শিল্প দেশের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতে পরিণত হতে পারে।

রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা এগোতে চায় দেশি কোম্পানিগুলো। গত অর্থবছরে প্রায় ১ লাখ ইউনিট ফ্রিজ রপ্তানি হয়েছে। ২০২৬ সালের মধ্যে তা ৩ লাখ ইউনিটে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে কোম্পানিগুলোর গ্লোবাল বিজনেস টিম। বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডগুলো প্রযুক্তির আধুনিকায়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। বর্তমানে বাজারে ওয়ালটন একক শীর্ষস্থানে থাকলেও কনকা, ভিশন, যমুনা, মিনিস্টার, ট্রান্সটেক ও স্মার্ট ব্র্যান্ডের ফ্রিজ কোম্পানিগুলো তাদেরও শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে। পাশাপাশি সিঙ্গার, স্যামসাং, এলজি, শার্প, হিটাচি, গ্রী, হাইকো ও হায়ারের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোও স্থানীয় কারখানায় যৌথ উৎপাদন বা সংযোজনের মাধ্যমে বাজার ধরার চেষ্টা করছে।

প্রযুক্তিগত রূপান্তর নিয়ে আরএফএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আর এন পাল বলেন, দেশীয় রেফ্রিজারেটর শিল্পের প্রধান শক্তি হলো গ্রাহকের চাহিদা, বাজেট ও স্থানীয় আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজস্ব কারখানায় বিশ্বমানের প্রযুক্তিতে পণ্য উৎপাদন। তাঁর ভাষ্য, বর্তমানে মানের সঙ্গে আপস না করেই শতভাগ কপার কনডেন্সার, ৫-স্টার এনার্জি রেটিং ও ইনভার্টার প্রযুক্তিসমৃদ্ধ সাশ্রয়ী ফ্রিজ বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, স্থানীয় বাজার ইতোমধ্যেই আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে স্বনির্ভর ও দ্রুত সম্প্রসারণশীল খাতে পরিণত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে মোবাইল অ্যাপ নিয়ন্ত্রিত স্মার্ট ও আইওটি প্রযুক্তির ফ্রিজ বাজারে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এদিকে, রেফ্রিজারেটর শিল্প দেশের কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, ভারী শিল্প হওয়া সত্ত্বেও উৎপাদন লাইনে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ নারী কর্মীর অংশগ্রহণ রয়েছে, যা এ খাতকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলছে।