বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটে ঝুঁকিতে মোবাইল সেবা

অ্যামটব

দেশজুড়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে মোবাইল সেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে অপারেটরগুলো। মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটব এক চিঠিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে জানায়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে জরুরি ভিত্তিতে অগ্রাধিকারমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হলে দেশব্যাপী মোবাইল টেলিকম সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। শনিবার (২০ এপ্রিল) বিটিআরসি চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, দেশের তিনটি বেসরকারি মোবাইল অপারেটর—গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংকের টাওয়ার (বিটিএস) এবং ডেটাসেন্টার সচল রাখতে প্রতিদিন ৭৯ হাজার ৬২১ লিটার ডিজেল ও ১৯ হাজার ৮৫৯ লিটার অকটেন প্রয়োজন হয়।

দেশের বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি পরিবহনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মোবাইল সেবা সচল রাখতে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য অ্যামটব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। অ্যামটব মহাসচিব মোহাম্মদ জুলফিকার স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে তিনটি মোবাইল অপারেটরের ২৭টি ডেটা সেন্টারের তালিকা সংযুক্ত করা হয়েছে। এতে প্রতিটি ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা, প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ চাহিদা (ডিমান্ড লোড) এবং বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালাতে প্রতি ঘণ্টায় সম্ভাব্য ডিজেল ব্যবহারের পরিমাণও উল্লেখ করা হয়েছে।

ওই তালিকা অনুযায়ী রবির ১০টি ডেটা সেন্টার চালাতে এক ঘণ্টায় খরচ হয় ১ হাজার ৬২২ লিটার ডিজেল। একইভাবে গ্রামীণফোনের আটটি ডেটা সেন্টার এক ঘণ্টা জেনারেটরে চালাতে লাগে ১ হাজার ৮৬৪ লিটার ডিজেল। আর বাংলালিংকের আটটি ডেটা সেন্টার জেনারেটরে চালাতে এক ঘণ্টায় খরচ হয় ৯৮৫ লিটার ডিজেল। অর্থাৎ সব মিলিয়ে শুধু ডেটা সেন্টারগুলোতে এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে খরচ হয় ৪ হাজার ৪৭১ লিটার ডিজেল।

অ্যামটবের চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশব্যাপী বিদ্যুৎ সরবরাহে মারাত্মক বিঘ্ন ও তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে মোবাইল অপারেটরদের সেবা পরিস্থিতি দ্রুত সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অবিলম্বে সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়া টেলিকম সেবা চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক ঝড়বৃষ্টির কারণে অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে, ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে বারবার ও দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিচ্ছে। একইসঙ্গে লোডশেডিংয়ের কারণে ডিজেল ও অকটেনের ব্যবহার বেড়ে গেছে; গত কয়েক দিনে দীর্ঘ সময় গ্রিড বিদ্যুৎ বন্ধ থাকায় জেনারেটরের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে করে মোবাইল টাওয়ার চালাতে প্রতিদিন তিনটি অপারেটরের প্রায় ৫২ হাজার ৪২৫ লিটার ডিজেল ও ১৯ হাজার ৮৫৯ লিটার অকটেন এবং ডেটা সেন্টার চালাতে আরও ২৭ হাজার ১৯৬ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হচ্ছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

চিঠিতে বলা হয়, ঝড়ের সময় অনেক এলাকায় প্রতিদিন ৫ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না এবং বিদ্যুৎ পুনঃস্থাপনেও দীর্ঘ সময় লাগছে। ফলে ডেটা সেন্টার, সুইচিং সুবিধা এবং ট্রান্সমিশন হাবসহ গুরুত্বপূর্ণ টেলিকম অবকাঠামো প্রায়ই গ্রিড বিদ্যুৎ ছাড়াই চালাতে হচ্ছে, যা নেটওয়ার্ক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে। দীর্ঘ সময়ের বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে এসব স্থাপনা পুরোপুরি ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। টাওয়ার (বিটিএস সাইট) ছাড়াও ডেটা সেন্টারগুলোও জেনারেটর দিয়ে চালানো হচ্ছে, যেখানে একটি ডেটা সেন্টার প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ লিটার ডিজেল ব্যবহার করে, যা দিনে প্রায় ৪ হাজার লিটার পর্যন্ত পৌঁছায়। তবে স্থানীয় পেট্রোল পাম্পগুলো এ পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করতে পারছে না বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া, আন্তঃজেলা জ্বালানি পরিবহনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

অপারেটরদের প্রস্তাব

এই পরিস্থিতি বিবেচনায় কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছে মোবাইল অপারেটররা, যার মধ্যে রয়েছে-

** বিদ্যুৎ বিভাগ, জ্বালানি বিভাগ, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সব মোবাইল অপারেটরকে নিয়ে জরুরি উচ্চ পর্যায়ের সমন্বয় সভা আহ্বান করা।
** প্রধান ডেটা সেন্টার ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।
** সংকটকালে সারাদেশের সব মোবাইল বেস স্টেশনকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহের আওতায় আনা।
** প্রয়োজনে ডিপো থেকে সরাসরি জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা।
** জরুরি টেলিকম কার্যক্রমের জন্য জ্বালানি পরিবহন নির্বিঘ্ন রাখতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবিলম্বে লিখিত নির্দেশনা দেওয়া।

এ বিষয়ে গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ রোববার বলেন, চলমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে বাংলাদেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটররা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সরকারের আন্তরিক সহযোগিতার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ; তবে বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দেশব্যাপী নিরবচ্ছিন্ন টেলিকম সেবা বজায় রাখতে সময়োপযোগী এবং সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন।