ভর্তুকি কমানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে গত ১ জুন থেকে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিল সরকার। এ সিদ্ধান্তের পর ৩ জুন আদেশ জারি করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে একদিন পরই আবাসিক গ্রাহকদের শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুতের বর্ধিত মূল্যহার প্রত্যাহার করা হয়। এতে বিতরণ কোম্পানিগুলোর বিদ্যুৎ বিক্রির গড় মূল্যহার কমে যায়। ফলে বাড়তি পাইকারি দামে বিদ্যুৎ কিনে লোকসানের আশঙ্কা জানিয়ে কমিশনের কাছে আবেদন করে বিতরণ সংস্থাগুলো। এর পরিপ্রেক্ষিতে খুচরা মূল্যহারের সঙ্গে সমন্বয় করে পাইকারি বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ২১ পয়সা কমিয়েছে বিইআরসি।
সর্বশেষ আদেশ অনুযায়ী, বিদ্যুতের গড় পাইকারি মূল্যহার দাঁড়িয়েছে ইউনিটপ্রতি ৮ টাকা ১৮ পয়সা। এর আগে ৩ জুন জারি করা আদেশে এ হার নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮ টাকা ৩৯ পয়সা। তবে নতুন সিদ্ধান্তের ফলে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ভর্তুকির চাহিদা বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আগের আদেশ কার্যকর হলে এ খাতে সরকারের ভর্তুকি লাগত প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা।
বিইআরসির তথ্যমতে, বিদ্যুতে সরকারি ভর্তুকি কমানোর সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ সংস্থা ও কোম্পানিগুলো দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। এসব প্রস্তাবের ওপর গত ২০ ও ২১ মে গণশুনানি শেষে বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা মূল্যহার পুনর্নির্ধারণ করে ৩ জুন আদেশ জারি করা হয়। ওই আদেশে অন্যান্য গ্রাহকশ্রেণির পাশাপাশি আবাসিক লাইফ লাইন (শূন্য থেকে ৫০ ইউনিট) এবং প্রথম ধাপের (শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট) বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়েছিল। নতুন মূল্যহার অনুযায়ী, লাইফ লাইনের প্রতি ইউনিটের দাম নির্ধারণ করা হয় ৫ টাকা ২৩ পয়সা এবং প্রথম ধাপে ৬ টাকা ১৮ পয়সা।
তবে সরকারের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ৪ জুন পিডিবি, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি), ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি), ঢাকা ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (ডেসকো), ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো) এবং নর্দান ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (নেসকো) আগের মূল্যহার পুনর্বহালের আবেদন করে। একই সঙ্গে কয়েকটি বিতরণ সংস্থা পাইকারি বিদ্যুতের দামও পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানায়।
আরইবির আবেদনে বলা হয়, শূন্য থেকে ৫০ এবং শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারী গ্রাহকরা নিম্ন আয়ের ও সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এ দুই শ্রেণির গ্রাহকের জন্য আগের মূল্যহার বহাল রাখলে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর প্রায় এক হাজার ৭৮০ কোটি টাকা ঘাটতি তৈরি হবে। এ অবস্থায় আবাসিক লাইফ লাইন ও প্রথম ধাপের দাম না বাড়িয়ে ৩৩ কেভি ভোল্টেজ পর্যায়ে পাইকারি বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ৭ টাকা ৩৯ দশমিক ৫৫ পয়সার পরিবর্তে ৭ টাকা ৯ পয়সা নির্ধারণের অনুরোধ জানায় সংস্থাটি।
বিতরণ কোম্পানিগুলোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৪ জুন ভার্চুয়াল শুনানির আয়োজন করে বিইআরসি। শুনানি শেষে নতুন আদেশে আবাসিক গ্রাহকদের লাইফ লাইন ও প্রথম ধাপের ক্ষেত্রে ৩ জুনের বর্ধিত মূল্যহার কার্যকর না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অর্থাৎ, আগের দাম বহাল রাখা হয়। নতুন আদেশে সব বিতরণ সংস্থার আবাসিক লাইফ লাইন গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৬৩ পয়সা এবং প্রথম ধাপের জন্য ৫ টাকা ২৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত জুন মাস থেকেই কার্যকর করা হয়।
এতে বিতরণ কোম্পানিগুলোর খুচরা বিদ্যুতের ভারিত গড় মূল্যহারও কমেছে। নতুন আদেশ অনুযায়ী, পিডিবির প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের খুচরা মূল্যহার ১১ টাকা ১৪ পয়সা, আরইবির ৯ টাকা ৬৪ পয়সা, ডিপিডিসির ১১ টাকা ৮৯ পয়সা, ডেসকোর ১২ টাকা ৫ পয়সা, ওজোপাডিকোর ১০ টাকা ৪৪ পয়সা এবং নেসকোর ১০ টাকা ৪৫ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে ৩ জুনের আদেশে পিডিবির খুচরা বিদ্যুতের ভারিত গড় মূল্যহার ছিল ১১ টাকা ৩২ পয়সা। আরইবির ৯ টাকা ৯৩ পয়সা, ডিপিডিসির ১১ টাকা ৯৯ পয়সা, ডেসকোর ১২ টাকা ১৭ পয়সা, ওজোপাডিকোর ১০ টাকা ৭১ পয়সা এবং নেসকোর ১০ টাকা ৬৮ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
আবাসিক গ্রাহকদের আগের মূল্যহার বহাল রাখায় বিতরণ কোম্পানিগুলোর রাজস্ব ঘাটতি কমাতে পাইকারি বিদ্যুতের দামও পুনর্নির্ধারণ করেছে বিইআরসি। নতুন আদেশ অনুযায়ী, পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়ের সংশোধিত মূল্যহার ২০২৬ সালের জুন থেকে কার্যকর হবে। পিডিবির তথ্যমতে, খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম কমায় বিতরণ কোম্পানিগুলোর লোকসান বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে পাইকারি মূল্যহার গড়ে ২১ পয়সা কমানো হয়েছে। এতে বিদ্যুতের ভারিত গড় পাইকারি মূল্যহার দাঁড়িয়েছে ৮ টাকা ১৮ পয়সা।
এর আগে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিদ্যুতের পাইকারি মূল্যহার ইউনিটপ্রতি ৭ টাকা ৪ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে আরইবির গ্রাহকসংখ্যা ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের অংশ বাড়ায় এ মূল্যহার কমে ৭ টাকায় দাঁড়ায়। সর্বশেষ সিদ্ধান্তে পাইকারি বিদ্যুতের দাম ১৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে, ৩ জুনের আদেশে দাম বাড়ানোর হার ছিল ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ। তবে সংশোধিত মূল্যহার কার্যকর হওয়ার পরও পিডিবির ঘাটতি মেটাতে সরকারকে বছরে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি দিতে হতে পারে। ফলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর মাধ্যমে ভর্তুকি কমানোর যে লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল, তা কতটা অর্জিত হবে, সে বিষয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
