বকেয়া ৯০ হাজার কোটি টাকা তুলতে মরিয়া এনবিআর

২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব সংগ্রহে ৪৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্য অর্জনে বড় বেসরকারি কোম্পানি ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কাছে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ বকেয়া রাজস্ব দ্রুত আদায়ে ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’ বা এডিআরের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘদিনের রাজস্ব বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির উপায় খুঁজতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত দুই মাসে গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনসহ (বিপিসি) কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, আদালতে বিচারাধীন রাজস্ব সংক্রান্ত মামলাগুলো এডিআরের মাধ্যমে নিষ্পত্তির সম্ভাবনা ও উপায় পর্যালোচনা করতে অর্থমন্ত্রী খুব শিগগিরই অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথেও বৈঠকে বসবেন। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে আমাদের প্রায় ৪৫ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধির এক বিশাল লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে বকেয়া পাওনা এবং আইনি জটিলতায় আটকে থাকা রাজস্ব উদ্ধারসহ আমরা বিভিন্ন পথ খতিয়ে দেখছি। তিনি আরও জানান, বর্তমানে ৩০ হাজারের বেশি মামলায় প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আইনি প্রক্রিয়ায় আটকে রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সরকার রাজস্ব-সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে চায় এবং এডিআরের মাধ্যমে বিরোধ সমাধানে আগ্রহী যেকোনো পক্ষকে স্বাগত জানাবে। তিনি বলেন, আদালতে বিচারাধীন রাজস্ব-সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কোনো পক্ষ এডিআরের মাধ্যমে বিরোধ মেটাতে আগ্রহী হলে সরকার তাদের স্বাগত জানাবে। মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে সম্ভাব্য সব উপায় খুঁজে দেখাই সরকারের মূল লক্ষ্য।

এনবিআরের বিবাদে আটকে ৯০,৮০০ কোটি টাকা

রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, এনবিআরের বিভিন্ন আপিল ট্রাইব্যুনাল ও আদালতে বিচারাধীন ৩০ হাজারের বেশি মামলায় প্রায় ৯০ হাজার ৮০০ কোটি টাকার রাজস্ব আটকে আছে। এর মধ্যে আয়কর বাবদ ২৫ হাজার কোটি, কাস্টমস বা শুল্ক বাবদ ২২ হাজার কোটি এবং ভ্যাট-সংক্রান্ত মামলায় ৪৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা আটকে রয়েছে। এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, কিছু রাজস্ব বিরোধ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত রয়েছে। কোনো কোনো বিরোধের নিষ্পত্তি দুই দশকেও হয়নি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করেছিল। এর বিপরীতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।

অন্যদিকে, গত ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বা বেতন কাঠামো কার্যকর করেছে সরকার, যার জন্য অতিরিক্ত ১.০৬ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রয়োজন হবে। এতে এনবিআরের ওপর রাজস্ব বাড়ানোর চাপ আরও তীব্র হয়েছে। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রাজস্ব আদায়ে খুব একটা গতি দেখা যায়নি। এই প্রেক্ষাপটে, দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তিকেই রাজস্ব আদায় বাড়ানোর অন্যতম প্রধান উপায় হিসেবে দেখছে সরকার।

ব্যাংক, বিপিসি ও টেলিকম খাতে বড় রাজস্ব-বিরোধ

এনবিআর কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, আয়কর-সংক্রান্ত মামলায় সোনালী ব্যাংকের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত রয়েছে। এছাড়া বিপিসির প্রায় ৭ হাজার কোটি, জনতা ব্যাংকের ২ হাজার ৫০০ কোটি এবং রবি আজিয়াটার ভ্যাট-সংক্রান্ত প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার বিরোধ আদালতে আটকে আছে। রবি আজিয়াটার চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার শাহেদ আলম বলেন, এ বিষয়ে কোম্পানিটির সঙ্গে এখনও অর্থমন্ত্রী বা এনবিআর কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়নি। তবে এমন একটি বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। তিনি বলেন, উদ্যোগটিকে তারা স্বাগত জানান, কারণ কোম্পানিটিও মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি চায়। এরই মধ্যে মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধগুলো সমাধানের জন্য এনবিআরকে অনুরোধ করা হয়েছে। কোম্পানিটির আরেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, এনবিআর রবির কাছে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা দাবি করেছে, যার বেশিরভাগই ভ্যাট-সংক্রান্ত বিরোধ। এসব বিরোধ বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন।

এদিকে বাংলালিংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, ব্যবসায়িক ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি এই জটিলতা নিয়ে আলোচনা করতে কোম্পানির প্রতিনিধি দল অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে। তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রীর সাথে আমাদের বৈঠক হয়েছে এবং তিনি বিষয়গুলো সমাধানের ব্যাপারে অত্যন্ত ইতিবাচক ছিলেন। আর গ্রামীণফোন জানিয়েছে, তাদের সাথে রাজস্ব সম্পর্কিত বিরোধের বিষয়গুলো বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে, তবে সংবিধিবদ্ধ বা আইনি এডিআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেগুলো সমাধানের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা যেতে পারে। লিখিত প্রশ্নের জবাবে গ্রামীণফোন জানায়, একটি দ্রুত, স্বচ্ছ এবং আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ হিসেবে, সংবিধিবদ্ধ এডিআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়গুলো সমাধানের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা যেতে পারে। গ্রামীণফোন এনবিআরের সাথে তাদের মামলায় জড়িত অর্থের পরিমাণ প্রকাশ করেনি। তবে রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুই পক্ষের মধ্যে রাজস্ব বিরোধের পরিমাণ প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা।

রাজস্ব-সংক্রান্ত বিরোধ যেভাবে সৃষ্টি হয়

আমদানি-রপ্তানি, স্থানীয় বিক্রি অথবা করদাতার রিটার্ন পরীক্ষার সময়— কোনো অমিল বা অসঙ্গতি চিহ্নিত হলে রাজস্ব-সংক্রান্ত আইনি বিরোধের সূচনা হতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট অংকের কর বা রাজস্ব দাবি করার আগে অডিট করতে পারে বা কাগজপত্র পরীক্ষা করে দেখতে পারে। কোনো কোম্পানি বা করদাতা সেই দাবির সাথে একমত না হলে, আপিল দায়ের করে সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন।

উদাহরণস্বরূপ, একজন আমদানিকারক একটি নির্দিষ্ট এইচএস কোডের অধীনে পণ্য ঘোষণা করতে পারেন, কিন্তু কাস্টমস কর্মকর্তারা নির্ধারণ করতে পারেন যে পণ্যটি উচ্চ আমদানিকরযুক্ত অন্য কোনো এইচএস কোডের অধীনে শ্রেণীবদ্ধ হওয়া উচিত ছিল। তখন কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত আমদানি কর দাবি করতে পারে এবং মিথ্যা বা ভুল ঘোষণার অভিযোগে জরিমানা আরোপ করতে পারে। সংক্ষুব্ধ পক্ষ শুরুতে এনবিআরের আপিল ট্রাইব্যুনালে যেতে পারে। ট্রাইব্যুনালের রায়ে সন্তুষ্ট না হলে পরবর্তীতে তারা উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে। অভিযোগ রয়েছে যে, কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সরকারের রাজস্ব প্রদান অনাবশ্যক বিলম্বিত করার উদ্দেশ্যে মামলা দায়ের করে। আবার এনবিআর কর্মকর্তাদের অবাস্তব বা তথ্যগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ দাবির কারণেও— মামলা বা বিরোধের সৃষ্টি হতে পারে।

এডিআর চালুর পর থেকেই নানা বাধা ও চ্যালেঞ্জ

রাজস্ব-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ২০১১-১২ অর্থবছরে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর ব্যবস্থা চালু করে এনবিআর। তবে চালুর পর থেকে এ ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়নি। এনবিআরের বাইরে থাকা বিশেষজ্ঞদের একটি প্যানেল এডিআর মামলায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে। তবে সমঝোতায় পৌঁছাতে এনবিআর ও করদাতা—উভয় পক্ষের সম্মতি প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে এনবিআর কর্মকর্তারা রাজস্ব মওকুফ বা কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নিতে অনাগ্রহী থাকেন। কারণ, পরবর্তী সময়ে এ ধরনের সিদ্ধান্তের জন্য আইনি বা বিভাগীয় জটিলতায় পড়ার আশঙ্কা থাকে। এ ছাড়া কোনো আইনি প্রশ্ন জড়িত থাকলে এডিআরের পরিধিও সীমিত। যেমন, আমদানি করা পণ্যের সঠিক এইচএস কোড নির্ধারণ নিয়ে বিরোধ সাধারণত এডিআরের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যায় না। মূলত তথ্যগত বিরোধ, যেমন কর কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে প্রকৃত প্রদেয় রাজস্ব বেশি না কম—এ ধরনের বিষয় নিষ্পত্তিতে এডিআর বেশি কার্যকর।

এনবিআরের ভ্যাট উইংয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রকৃত অর্থে এডিআরের মাধ্যমে খুব কম ভ্যাট মামলার সমাধান করা সম্ভব হয়েছে। অভিজ্ঞতার আলোকেও তিনি বলেন, এডিআরের ব্যর্থতার কারণগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার না করা পর্যন্ত, একে কার্যকর করা কঠিন হবে। এনবিআরের সাবেক সদস্য এবং এডিআরের সাবেক মধ্যস্থতাকারী সৈয়দ মো. আমিনুল করিম বলেন, এডিআরের ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় কারণ হলো কর্তৃপক্ষের অঙ্গীকারের অভাব। তিনি বলেন, এডিআর সেশনে রাজস্ব বোর্ডের প্রতিনিধিত্বকারী কর্মকর্তারা ছাড় দিতে অনিচ্ছুক ছিলেন। তদুপরি, যে কর্মকর্তা মূলত করের দাবি তুলেছিলেন, তাকেই এডিআর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পাঠানো হতো। তাই যে কর্মকর্তা শুরুতে ১০ টাকা রাজস্ব দাবি করেছিলেন, তিনি মধ্যস্থতার সময় হঠাৎ কেন ৫ টাকা মেনে নেবেন?

তারা স্বাভাবিকভাবেই তাদের মূল দাবিতে অনড় থাকবেন। তাই এনবিআরের একটি নিবেদিত ও স্বতন্ত্র এডিআর প্যানেল থাকা উচিত ছিল, আমিনুল যোগ করেন। আরেকটি বড় কারণ ছিল যে, কর্মকর্তারা ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা বা সরকারি নজরদারির ভয়ে রাজস্ব মওকুফ বা ছাড় দেওয়ার ঝুঁকি নিতে চাননি। উদাহরণ দিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, একজন কর্মকর্তা মওকুফ অনুমোদন করার পর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় পড়েন এবং তাঁর অবসরোত্তর সুবিধাদি স্থগিত করা হয়। মন অভিজ্ঞতার পর কোনো কর্মকর্তা কি আর এই ঝুঁকি নেবেন? তিনি প্রশ্ন রাখেন। আমিনুল মনে করেন, এডিআর আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার জন্য এই সমস্যাগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ অপরিহার্য।

২০২৩ সালের ঘটনাই কর্মকর্তাদের করে তুলেছে অতিরিক্ত সতর্ক

২০২৩ সালে চারটি মোবাইল ফোন অপারেটর ও এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিট-ভ্যাটের (এলটিইউ-ভ্যাট) মধ্যকার বিরোধ এডিআরের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়। এর মাধ্যমে কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে সরকার প্রায় ১৯০ কোটি টাকা ভ্যাট আদায় করতে সক্ষম হয়। তবে সমঝোতার অংশ হিসেবে প্রায় ১৫২ কোটি টাকার সুদ মওকুফ করা হয়েছিল। এ সিদ্ধান্তের পর তৎকালীন বৃহৎ করদাতা ইউনিটের কমিশনার ওয়াহিদা রহমান চৌধুরী আইনি জটিলতায় পড়েন। সরকারের আর্থিক ক্ষতিসাধনের অভিযোগে দুদক তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করে। অবসরোত্তর ছুটিতে যাওয়ার পর তাঁর অবসরকালীন ভাতাসহ বিভিন্ন সুবিধাও আটকে দেওয়া হয়। এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, এরপর ওই কোম্পানিগুলোর আগে বন্ধ থাকা ফাইলও পুনরায় খোলা ও তদন্ত করা হয়। এ ঘটনার পর থেকে এডিআরের মাধ্যমে রাজস্ব বিরোধ নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত নিতে এনবিআর কর্মকর্তাদের মধ্যে অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে কোম্পানিগুলোর মধ্যেও এডিআরের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির আগ্রহ কমে গেছে।