এক মাসেই গত অর্থবছরের চার গুণ সঞ্চয়পত্র বিক্রি

চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ২ হাজার ৫৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে, যা গত অর্থবছরের (২০২৫-২৬) পুরো সময়ের নিট বিক্রির প্রায় চার গুণ। একক মাস হিসেবে গত চার বছরের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ নিট বিক্রি। এর আগে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ২ হাজার ৫২৩ কোটি টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল। পরের মাস মার্চে বিক্রির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৮১৪ কোটি টাকা। এরপর আর কোনো মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ২ হাজার কোটি টাকা ছাড়ায়নি। বরং বেশির ভাগ মাসেই নিট বিক্রি ঋণাত্মক ছিল।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর রোববার জুলাই মাসের বিক্রির এই হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে। নিট বিক্রি বলতে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের সুদ-আসল পরিশোধের পর অবশিষ্ট যে টাকা সরকারের কোষাগারে জমা থাকে, তাকে বোঝায়। সরকার এই অর্থ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসহ রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজে লাগায়।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের জুলাইয়ে নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৯৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। আর সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১২ মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল মাত্র ৫৪০ কোটি ২০ লাখ টাকা। এর আগের টানা তিন অর্থবছরে নিট বিক্রি ছিল ঋণাত্মক। অর্থাৎ, ওই তিন বছরে যে পরিমাণ সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে, তার চেয়ে বেশি টাকা সরকারের খরচ হয়েছে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল মেটাতে।

সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত ৩১ জুলাই শেষে সঞ্চয়পত্র বাবদ সরকারের ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৬১ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এক মাস আগে জুন শেষে এই স্থিতি ছিল ৩ লাখ ৩৪ হাজার ২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। অর্থবছরের শুরুতে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে এই উল্লম্ফনের কারণ জানতে চাইলে বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ব্যাংক খাতের বর্তমান বিশৃঙ্খল অবস্থার কারণে মানুষ আস্থা সংকটে ভুগছে।

শেয়ারবাজারেও মন্দা কাটছে না। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের সঞ্চয় কমলেও, যাদের কাছে যেটুকু থাকছে তারা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সঞ্চয়পত্রকেই বেছে নিচ্ছেন। তিনি বলেন, সঞ্চয়পত্রে কোনো ঝুঁকি নেই, টাকা মার যাওয়ার শঙ্কা নেই এবং জরুরি প্রয়োজনে ভাঙানো যায়। মুনাফার হারও তুলনামূলকভাবে এখনও ভালো। সব মিলিয়ে সঞ্চয়পত্রের দিকেই ঝুঁকছে মানুষ।

বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার সাধারণত ব্যাংক ব্যবস্থা ও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। পরে বিএনপি সরকার সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা করে। ওই অর্থবছরে মোট ৯২ হাজার ৬১৭ কোটি ৭০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়। এর বিপরীতে সুদ ও আসল বাবদ ৯২ হাজার ৭৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। এর মধ্যে শুধু মুনাফা বাবদই পরিশোধ করা হয়েছে ৪৭ হাজার ৫১০ কোটি ৩০ লাখ টাকা। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা আরও কমিয়ে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার।