বিশ্বজুড়ে নতুন এক বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে প্লাস্টিক। কম খরচে সহজলভ্য এই উপাদান জীবনকে যতটা না সহজ করেছে, তার চেয়ে বেশি তৈরি করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, খাবার ও পানীয় সংরক্ষণে ব্যবহৃত বোতল ও প্যাকেট থেকে সূক্ষ্ম প্লাস্টিক কণা মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। এমনকি বৈশ্বিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, বিশ্বের প্রায় ৮৩ শতাংশ কলের পানির নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক ফাইবার শনাক্ত হয়েছে।
এই মাইক্রোপ্লাস্টিক কণার ইতোমধ্যেই প্রাণীদের শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। গবেষকদের মত, মানুষের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রভাবের আশঙ্কা রয়েছে। সিনথেটিক কাপড়কেও গবেষকরা মাইক্রোপ্লাস্টিকের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। জার্নাল অব কনটামিন্যান্ট হাইড্রোলজিতে প্রকাশিত গবেষণা তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালে ৭৯ শতাংশ প্লাস্টিক বর্জ্য মাটিচাপা কিংবা ফেলে দেওয়া হয়েছে। পুনর্ব্যবহার করা হয়েছে মাত্র ৯ শতাংশ প্লাস্টিক বর্জ্য। এই মাইক্রোপ্লাস্টিক মাছ ও ইঁদুরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ক্ষতি করেছে। এমনকি অ্যান্টার্কটিকার তাজা তুষারেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
প্লাস্টিকের এই বাড়তে থাকা ঝুঁকির মাঝেই আশার বার্তা দিয়েছেন ব্রাজিল ও যুক্তরাজ্যের একদল বিজ্ঞানী। গত এপ্রিলে প্রকাশিত এক গবেষণায় তারা জানিয়েছেন, সজনেগাছের বীজ খাবার পানি থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূর করতে সক্ষম। ‘অলৌকিক গাছ’ নামে পরিচিত সজনে পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ একটি উদ্ভিদ, যার ঔষধি ব্যবহারও দীর্ঘদিনের। নতুন এই গবেষণায় আরও জানা গেছে, সজনের বীজ শুধু পুষ্টিকরই নয়, পানিশোধনেও বেশ কার্যকর। গবেষকদের মতে, দ্রুত বেড়ে ওঠা এই গাছের বীজের নির্যাস পানীয় জল থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণে প্রচলিত রাসায়নিকের মতোই কার্যকর ফল দেয়।
গবেষণাপত্রের সহলেখক এবং সাও পাওলো স্টেট ইউনিভার্সিটির (ইউনেস্প) বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক আদ্রিয়ানো গনসালভেস দোস রেইস জানিয়েছেন, প্রাচীন গ্রিক, রোমান ও মিসরীয়রাও পানি বিশুদ্ধ করতে সজনে গাছের ব্যবহার করতেন—এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, ‘হাজার হাজার বছর ধরে পানি বিশুদ্ধ করতে সজনে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।’ অধ্যাপক আদ্রিয়ানো ও তার সহকর্মীরা গত এক দশক ধরে সজনে বীজ নিয়ে গবেষণা করছেন। পানি বিশুদ্ধ করার ক্ষেত্রে তঞ্চনকারী পদার্থ হিসেবে এর ভূমিকা নিয়ে তারা কাজ করছেন। এই বীজ পানির ক্ষুদ্র কণাগুলোকে একত্রিত করে ফেলে, যাতে সেগুলো সহজে ছেঁকে ফেলা যায়।
মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র কণা, যা ১ ইঞ্চির ২৫ হাজার ভাগের ১ ভাগ (১ মাইক্রোমিটার) পর্যন্ত ছোট হতে পারে। ২০২৪ সালের এক গবেষণায় বিশ্বের কলের পানির ৮৩ শতাংশেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এই প্লাস্টিক কণাগুলো মানুষের মস্তিষ্ক, প্রজনন অঙ্গ ও রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থায় জায়গা করে নিচ্ছে। মানুষের ওপর মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাব বিজ্ঞানীরা এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি। তবে প্রাণীর ওপর গবেষণায় প্রজনন সমস্যা ও হরমোনের ভারসাম্যহীনতার সঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
বোতলজাত পানির ব্যবহার বাড়ায় গবেষকরা বিশেষভাবে পিভিসি ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিকের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। আদ্রিয়ানো জানান, এটি সবচেয়ে ক্ষতিকর প্লাস্টিকগুলোর একটি। গবেষণায় দেখা গেছে, সজনে বীজের নির্যাস ব্যবহার করে গড়ে ১৮ দশমিক ৮ মাইক্রোমিটার আকারের মাইক্রোপ্লাস্টিক—যা মানুষের চুলের পুরুত্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ—ফিল্টার করা সম্ভব হয়েছে। পরীক্ষায় প্রমাণ মিলেছে, এই নির্যাস কলের পানি থেকে সর্বোচ্চ ৯৮ দশমিক ৫ শতাংশ মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণ করতে পারে। ফলে প্রাকৃতিক এই উপাদানটি বহুল ব্যবহৃত রাসায়নিক কোয়াগুল্যান্ট অ্যালুমিনিয়াম সালফেট (ফিটকিরি)-এর প্রায় সমান কার্যকর। গবেষকদের মতে, বেশি ক্ষারীয় পানিতে সজনে বীজ ফিটকিরির চেয়েও ভালো কাজ করে। আদ্রিয়ানো আরও বলেন, ফিটকিরির অতিরিক্ত ব্যবহার বিষক্রিয়া ও স্নায়বিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে, যেখানে সজনে বীজ তুলনামূলকভাবে নিরাপদ এবং কম বর্জ্য তৈরি করে।
ইউনিভার্সিটি অব নিউ মেক্সিকো হেলথ সায়েন্সেস সেন্টারের ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেসের অধ্যাপক ম্যাথিউ ক্যাম্পেন দুটি উপকারিতার কথা তুলে ধরেন। তবে তিনি এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না। ম্যাথিউ বলেন, অ্যালুমিনিয়ামভিত্তিক ফিল্টারের বদলে সজনে বীজের ব্যবহার পিভিসি মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণের একটি টেকসই ও সাশ্রয়ী সমাধান হতে পারে। এতে অ্যালুমিনিয়াম খননের প্রয়োজনীয়তা কমবে এবং পরিবেশের ক্ষতিও কম হবে। তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, একটি সজনে বীজ প্রায় ১০ লিটার পানি বিশুদ্ধ করতে পারে।
আদ্রিয়ানো বলেন, ‘এটি আশাব্যঞ্জক হলেও বড় শহরের উচ্চ প্রবাহের পানি শোধনাগারে ব্যবহারের জন্য বিপুল পরিমাণ বীজ প্রয়োজন হবে।’ আরেকটি সম্ভাব্য সমস্যা হলো, বেশি বীজ ব্যবহার করলে পানিতে বেশি জৈব অবশিষ্টাংশ থেকে যেতে পারে, যা পরে অপসারণ করতে হবে। অধ্যাপক ম্যাথিউ ক্যাম্পেন মনে করেন, সজনে বীজের নির্যাস কীভাবে কাজ করে এবং এই পদ্ধতিতে কত বড় পরিসরে সাশ্রয়ীভাবে পানি বিশুদ্ধ করা সম্ভব, তা বুঝতে আরও গবেষণার প্রয়োজন। অন্যান্য মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং ন্যানোপ্লাস্টিকের ক্ষেত্রেও সজনে কাজ করে কি না, তা জানাও অত্যন্ত জরুরি।
ন্যানোপ্লাস্টিক হলো মানুষের চুলের গড় প্রস্থের প্রায় এক-হাজার ভাগের এক ভাগ, যা মানবদেহে প্রবেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। সজনে বীজ বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক অপসারণে কার্যকর হবে বলে আশাবাদী আদ্রিয়ানো। তিনি জানিয়েছেন, তার দল এ নিয়ে আরও গবেষণা করবে। অধ্যাপক ম্যাথিউ বলেন, ‘মানবজাতি ক্রমবর্ধমান হারে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসছে এবং আগামী বহু দশকেও এই প্রবণতা কমার সম্ভাবনা নেই। তাই মাইক্রোপ্লাস্টিক সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা এখন অত্যন্ত জরুরি।’
