চায়ের দোকান থেকে শুরু করে শপিংমল—সব ধরনের ব্যবসায় ডিজিটাল লেনদেন সহজ করতে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে থাইল্যান্ড। মোবাইল নম্বর বা জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে ব্যাংক হিসাব যুক্ত করে অর্থ পাঠানো, কিউআর কোড স্ক্যান করে কেনাকাটার মূল্য পরিশোধ এবং সরকারি ভাতা সরাসরি উপকারভোগীর হিসাবে পাঠানোর মতো সেবা চালু রয়েছে দেশটিতে। ‘প্রম্পটপে’ নামের এ ব্যবস্থা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে।
বাংলাদেশে বাংলা কিউআর, মোবাইল আর্থিক সেবা ও আন্তঃব্যাংক লেনদেনের ব্যবস্থা থাকলেও নগদ টাকার ব্যবহার কমিয়ে সব ধরনের ব্যবসায় ডিজিটাল পেমেন্ট জনপ্রিয় করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে লেনদেনের খরচ কমানো, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল ব্যবস্থায় যুক্ত করা এবং সরকারি অর্থ বিতরণে স্বচ্ছতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব ও ডিজিটাল ওয়ালেটকে একটি সমন্বিত পরিচয়ব্যবস্থার আওতায় আনা গেলে আর্থিক সেবা গ্রহণ আরও সহজ হবে। বাংলাদেশে এ জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর অনেক কিছুই রয়েছে। এখন বিভিন্ন ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় ও কার্যকর আন্তঃসংযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভা উপলক্ষে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে দেশটির ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের ডিজিটাল লেনদেনের প্রসারে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এক ব্যবস্থায় সহজ লেনদেন
থাইল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে প্রম্পটপে চালু হয়। এ ব্যবস্থায় গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে মোবাইল নম্বর বা জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর যুক্ত করে অর্থ পাঠানো যায়। প্রচলিত ব্যাংক হিসাব নম্বর ব্যবহার করেও লেনদেন করা সম্ভব। এ ব্যবস্থার অন্যতম সুবিধা হলো, অর্থ পাঠানোর জন্য প্রাপকের দীর্ঘ ব্যাংক হিসাব নম্বর মনে রাখার প্রয়োজন হয় না। নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর বা পরিচিত পরিচয় নম্বর ব্যবহার করেই অর্থ স্থানান্তর করা যায়। এতে লেনদেন সহজ হয় এবং খরচও কমে। থাইল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ হাজার বাথ পর্যন্ত প্রম্পটপে লেনদেনে কোনো ফি লাগে না। তবে দেশটির অধিকাংশ ব্যাংক ২০১৮ সাল থেকেই মোবাইলভিত্তিক ডিজিটাল লেনদেনের ফি মওকুফ করে আসছে।
প্রম্পটপে শুধু ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির মধ্যে অর্থ স্থানান্তরের ব্যবস্থা নয়। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের লেনদেন, বিল পরিশোধ, কর ফেরত এবং সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থ বিতরণেও এটি ব্যবহৃত হয়। একই অবকাঠামো ব্যবহার করে ব্যক্তি, ব্যবসা ও সরকারের লেনদেন সহজ করা সম্ভব হয়েছে। সোনালী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরীর মতে, বাংলাদেশেও ব্যাংকিং সেবা, অর্থ স্থানান্তর ও অন্যান্য আর্থিক লেনদেন একটি একক পরিচয়ের মাধ্যমে পরিচালনার ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে সাধারণ মানুষের আর্থিক সেবা গ্রহণ সহজ হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল লেনদেনের তথ্য কাজে লাগিয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়ার সুযোগ বাড়ানো সম্ভব। তিনি মনে করেন, এ ধরনের ব্যবস্থা বাস্তবায়নে শুধু ঘোষণা যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ করে সুস্পষ্ট নীতিমালা ও নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। প্রথম ছয় মাসে কী কাজ হবে, পরবর্তী ছয় মাসে কী অগ্রগতি অর্জন করতে হবে এবং কোথায় পরীক্ষামূলকভাবে কার্যক্রম চালানো হবে—এসব বিষয় পরিকল্পনায় স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন। নীতিমালা ও কর্মপরিকল্পনা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলে উদ্যোগটির লক্ষ্য ও বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সবাই জানতে পারবেন।
কিউআর কোডেই কেনাকাটার মূল্য পরিশোধ
থাইল্যান্ডের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেন। ক্রেতা নিজের ব্যাংকের মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে দোকানে থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করে পণ্যের দাম পরিশোধ করতে পারেন। এতে দোকানদারকে প্রতিটি ডিজিটাল পেমেন্ট সেবাদাতার জন্য আলাদা যন্ত্র বসানোর প্রয়োজন কমে। ক্রেতারও নগদ টাকা বহন বা খুচরা টাকা সংগ্রহের ঝামেলা কমে যায়। থাইল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সীমান্তপারের ডিজিটাল পেমেন্ট সংযোগও সম্প্রসারণ করেছে। ফলে নির্দিষ্ট অংশীদার দেশগুলোর গ্রাহকেরা থাইল্যান্ডে কিংবা থাই পর্যটকেরা বিদেশে গিয়ে অংশগ্রহণকারী ব্যাংকের অ্যাপ ব্যবহার করে কিউআর কোডের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করতে পারেন। কিছু দেশের সঙ্গে মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে সীমান্তপারের অর্থ স্থানান্তরের ব্যবস্থাও রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এ অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে পর্যটন, প্রবাসী আয়, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও সীমান্তপারের বাণিজ্যে সহজ এবং কম খরচের ডিজিটাল লেনদেন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে এ ধরনের সংযোগ চালু করতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে সমঝোতা, প্রযুক্তিগত সমন্বয়, নিরাপত্তা এবং অর্থপাচার প্রতিরোধের ব্যবস্থা প্রয়োজন। মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, বিদেশের কার্যকর প্রযুক্তি ও আর্থিক সেবার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজে লাগাতে হবে। বিদেশে গিয়ে নতুন সেবার অভিজ্ঞতা অর্জনই যথেষ্ট নয়, সেগুলো দেশের আর্থিক ও ব্যবসায়িক পরিবেশে কীভাবে কার্যকর করা যায়, তা নিয়েও কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশে রয়েছে বাংলা কিউআর
বাংলাদেশেও ডিজিটাল পেমেন্টের জন্য জাতীয় পর্যায়ের অবকাঠামো গড়ে তোলার কাজ চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ‘এক দেশ, এক কিউআর’ ধারণার ভিত্তিতে বাংলা কিউআর চালু হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলা কিউআর ব্যবস্থায় একই কোড ব্যবহার করে বিভিন্ন অংশগ্রহণকারী ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে মূল্য পরিশোধের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে ব্যবসায়ীদের আলাদা আলাদা কিউআর কোড ব্যবহারের প্রয়োজন কমে।
২০২৫ সালের ১ নভেম্বর থেকে ব্যাংক, পেমেন্ট সেবাদাতা ও মোবাইল আর্থিক সেবাদাতাদের মধ্যে আন্তঃসংযোগের মাধ্যমে লেনদেন চালু হয়। একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর থেকে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের হিসাবে তাৎক্ষণিক অর্থ জমার ব্যবস্থাও কার্যকর করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বাংলা কিউআর ব্যবস্থায় প্রায় ১০ লাখ ব্যবসায়ীকে যুক্ত করা হয়েছিল। তবে শুধু ব্যবসায়ী যুক্ত করলেই হবে না, তাঁদের দোকানে নিয়মিত ডিজিটাল লেনদেন হচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
মুসলিম চৌধুরীর মতে, ডিজিটাল লেনদেনের তথ্য কাজে লাগিয়ে জামানত ছাড়াই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। যাঁদের লেনদেনের রেকর্ড ভালো এবং নিয়মিত বিল পরিশোধের ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের চার-পাঁচ লাখ টাকা, এমনকি ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ জন্য সমন্বিত পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি সেটিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তুলতে হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব ও ডিজিটাল ওয়ালেটের মধ্যে কার্যকর সংযোগ গড়ে তোলা গেলে আর্থিক সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও সহজ হতে পারে।
নগদ টাকার নির্ভরতা কমানোই বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে মোবাইল আর্থিক সেবার বিস্তার ঘটলেও দোকানপাটে কেনাকাটার ক্ষেত্রে নগদ টাকার ব্যবহার এখনো উল্লেখযোগ্য। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণে আগ্রহী হলেও লেনদেনের খরচ, প্রযুক্তি ব্যবহারের জটিলতা, হিসাব ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল সেবার প্রতি আস্থার অভাব তাঁদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদের দপ্তর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক গবেষণায় এসব সমস্যার পাশাপাশি সব পেমেন্ট সেবার মধ্যে সমন্বয়, ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ এবং গ্রাহকদের সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
এ পরিস্থিতিতে প্রথম কাজ হতে পারে বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়ানো। রাজধানীর বড় বিপণিবিতান ও অভিজাত রেস্তোরাঁর বাইরে কাঁচাবাজার, মুদি দোকান, চায়ের দোকান, গণপরিবহন এবং জেলা-উপজেলার ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও এ সেবা ছড়িয়ে দিতে হবে। একই সঙ্গে গ্রাহক যে ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবাই ব্যবহার করুন না কেন, যেন সহজেই লেনদেন করতে পারেন, সেই সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। লেনদেনের খরচ কমানো, দ্রুত অর্থ জমা, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং প্রতারণার ক্ষেত্রে কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
মুসলিম চৌধুরী বলেন, ডিজিটাল লেনদেনের তথ্য কাজে লাগিয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আর্থিক সক্ষমতা মূল্যায়নের ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি তাঁদের অর্থায়নের সুযোগও তৈরি হতে পারে। তবে এ জন্য তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ নীতিমালা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
জামানত ছাড়াই ক্ষুদ্র ঋণের সুযোগ
ডিজিটাল লেনদেনের তথ্য ব্যবহার করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব বলে মনে করেন মুসলিম চৌধুরী। তাঁর মতে, তরুণ উদ্যোক্তারা অনেক সময় প্রয়োজনীয় জামানত না থাকায় ব্যাংকঋণ পান না। অথচ তাঁদের ব্যবসায়িক লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করা সম্ভব। ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ব্যবসায়িক লেনদেন, নিয়মিত বিল পরিশোধ এবং অন্যান্য আর্থিক আচরণের তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা গেলে একজন উদ্যোক্তার ঋণযোগ্যতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্য বিশ্লেষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব তথ্যের ভিত্তিতে ঋণযোগ্যতার স্কোরও নির্ধারণ করা যেতে পারে।
এভাবে যাঁদের লেনদেনের রেকর্ড ভালো এবং নিয়মিত বিল পরিশোধের ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের চার-পাঁচ লাখ টাকা, এমনকি ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। ঋণের কিস্তিও ডিজিটাল ব্যবস্থায় পরিশোধ বা কর্তনের সুযোগ রাখা যেতে পারে। তবে এ ধরনের ঋণব্যবস্থা চালুর ক্ষেত্রে শুধু ডিজিটাল লেনদেনের পরিমাণের ওপর নির্ভর না করে উদ্যোক্তার প্রকৃত আয়, ব্যবসার স্থায়িত্ব ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি তথ্যের গোপনীয়তা, ভুলভাবে ঋণযোগ্যতা নির্ধারণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মূল্যায়নে সম্ভাব্য পক্ষপাত মোকাবিলার ব্যবস্থাও রাখতে হবে।
সরকারি ভাতা ও কর ব্যবস্থায় ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ
থাইল্যান্ডের প্রম্পটপে ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হলো সরকারি অর্থ সরাসরি উপকারভোগীর কাছে পৌঁছে দেওয়া। এতে অর্থ বিতরণের প্রক্রিয়া সহজ হয় এবং নির্ধারিত ব্যক্তির কাছে অর্থ পৌঁছানোর বিষয়টি যাচাই করা সহজ হতে পারে। বাংলাদেশেও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতা, সরকারি অনুদান, শিক্ষাবৃত্তি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তার অর্থ ডিজিটাল মাধ্যমে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে উপকারভোগীর পরিচয় যাচাই, সঠিক হিসাব নির্বাচন, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং যাঁদের স্মার্টফোন নেই, তাঁদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে হবে। একইভাবে ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল লেনদেনের তথ্য ব্যবহার করে তাঁদের প্রকৃত বিক্রি ও নগদ প্রবাহ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। এতে ভবিষ্যতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে। তবে গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের ব্যক্তিগত আর্থিক তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
ডিজিটাল লেনদেনে নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ
ডিজিটাল পেমেন্টের প্রসার ঘটাতে গিয়ে সাইবার প্রতারণা, ভুয়া কিউআর কোড, ভুল হিসাবে অর্থ পাঠানো এবং ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
এ জন্য শক্তিশালী গ্রাহক যাচাই, তাৎক্ষণিক লেনদেনের বার্তা, প্রতারণা শনাক্তকরণ এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা প্রয়োজন। পাশাপাশি গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল আর্থিক বিষয়ে সচেতন করতে হবে। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ, গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এবং প্রযুক্তিতে কম অভ্যস্ত ব্যক্তিদের জন্য সহজ ব্যবহারবিধি ও সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। ডিজিটাল লেনদেনের কারণে যেন কেউ আর্থিক সেবার বাইরে চলে না যান, সে বিষয়েও নজর রাখতে হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব ও ডিজিটাল ওয়ালেটের মধ্যে সমন্বিত সংযোগ গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, গ্রাহকের সম্মতি, তথ্য ব্যবহারের সীমা এবং অভিযোগ প্রতিকারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তথ্যের অপব্যবহার ঠেকাতে কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহিও প্রয়োজন।
বাংলাদেশের করণীয় কী
থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন আন্তঃসংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব ও ডিজিটাল ওয়ালেটের মধ্যে কার্যকর সংযোগ গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য কম খরচে সহজ ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করতে হবে। চতুর্থত, সরকারি অর্থ বিতরণ থেকে শুরু করে ব্যবসায়িক লেনদেন পর্যন্ত ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, ডিজিটাল লেনদেনের তথ্য কাজে লাগিয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ মূল্যায়নের বিকল্প পদ্ধতি গড়ে তুলতে হবে। মুসলিম চৌধুরীর মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। পরীক্ষামূলকভাবে কার্যক্রম চালিয়ে ফলাফল মূল্যায়ন এবং পর্যায়ক্রমে পরিসর বাড়ানো গেলে উদ্যোগগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হবে।
