নতুন ২০২৬–২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় প্রায় ৪৭ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্যে তামাকসহ উচ্চ সম্ভাবনাময় খাতে দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান চালানো এবং বড় কর-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জন কতটা বাস্তবসম্মত—তা নিয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২৬ জুলাই রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনবিআর সদর দপ্তরে আয়োজিত এক বৈঠকে ঊর্ধ্বতন ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়। বৈঠকে কর্মকর্তারা বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে কঠিন বলে উল্লেখ করলেও, সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে জোর দিয়ে কাজ চালানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে এনবিআরের শীর্ষ নেতৃত্ব।
তামাক খাত, অডিট ও কর বিরোধ নিষ্পত্তিতে জোর
এনবিআরের শীর্ষ পর্যায় থেকে সর্বাধিক রাজস্ব আহরণকারী তামাক খাতে নজরদারি জোরদার এবং বড় অঙ্কের কর-সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে নির্বাচিত ৬৬ হাজার করদাতার ফাইলের অডিট দ্রুত শেষ করার সিদ্ধান্তের কথাও জানিয়েছেন বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তারা। ভ্যাট বিভাগের এক কমিশনার, নাম প্রকাশ না করার শর্তে, জানান—সিগারেটের প্যাকেটে কিউআর কোড সংযুক্ত করে তা যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু এবং তামাক কারখানায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক ক্যামেরা বসানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। বর্তমানে তামাক খাত থেকে সরকার বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব পায়। তবে জাল সিগারেট, চোরাচালানসহ নানা কারণে এই খাতে বড় অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকি হচ্ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২৩টি বড় রাজস্ব-সংশ্লিষ্ট মামলা চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব জড়িত বলে এনবিআর সূত্র জানিয়েছে। এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে অর্থমন্ত্রীর নির্দেশনায় আদালতের বাইরে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) পদ্ধতিতে সেগুলোর নিষ্পত্তির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, অডিটের জন্য নির্বাচিত ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি এবং রাজস্ব ফাঁকি রোধে মাঠপর্যায়ে ব্যাপক অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিব।
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উদ্বেগ
বৈঠকে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা আরও জানান, প্রতিমাসের পরিবর্তে প্রতি তিন মাস অন্তর ভ্যাট আদায়ের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, রাজস্ব আদায়ে যেসব পরিচালনাগত সমস্যা রয়েছে, সেগুলোর বিস্তারিত এক সপ্তাহের মধ্যে মাঠপর্যায়ের দপ্তরগুলোকে এনবিআরে পাঠাতে হবে। এসব বিষয় অর্থমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টার কাছে উপস্থাপন করা হবে। কর্মকর্তাদের মনোবল বাড়াতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মাঠপর্যায়ের রাজস্ব কর্মকর্তাদের একটি বৈঠকের সম্ভাবনাও আলোচনা হয়। বৈঠকে উপস্থিত এক কমিশনার জানান, আগামী ১৮ আগস্ট এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের প্রভাব
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে সাম্প্রতিক প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের প্রভাবও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এনবিআর বিলুপ্ত করে দুটি আলাদা বিভাগ গঠনের সরকারি সিদ্ধান্তের কিছু দিক নিয়ে কর্মকর্তারা আপত্তি তোলেন। বিশেষ করে নতুন দুটি বিভাগের নিয়ন্ত্রণ প্রশাসন ক্যাডারের হাতে যাওয়ার বিষয়টি কেন্দ্র করে তারা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। আন্দোলনের সময় দেশের বিভিন্ন কাস্টমস হাউসের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। পরবর্তীতে সরকারের কঠোর অবস্থানের মুখে অন্তত পাঁচজন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়, ২০ জনের বেশি কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয় এবং শত শত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়। একই সময়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগও ওঠে। কর্মকর্তাদের দাবি, এসব ঘটনার পর বড় পরিসরে রাজস্ব ফাঁকি রোধে অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে তাদের আত্মবিশ্বাস কমে গেছে। এমনকি কিছু অভিযানে হামলার শিকার হলেও প্রয়োজনীয় সহায়তা পাননি বলেও অভিযোগ করেন তারা।
এমন পরিস্থিতিতে কর্মকর্তাদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে বলে বৈঠকে আলোচনা হয়। এনবিআরের কার্যক্রম নিয়মিত তদারকির জন্য অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর প্রতি সপ্তাহে এক দিন এনবিআর কার্যালয়ে অফিস করবেন বলেও বৈঠকে জানানো হয়েছে।
