দেশজুড়ে চিহ্নিত ৩ হাজার ৫৮৬ জন চাঁদাবাজের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫৬৫ জনের নাম রয়েছে নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের তালিকায়। একইভাবে ২ হাজার ২৫৮ জন আলোচিত সন্ত্রাসীর মধ্যে সর্বোচ্চ ৪০৮ জন এই অঞ্চলের। অন্যদিকে, দেশজুড়ে চিহ্নিত ৫৩৪ জন ছিনতাইকারীর মধ্যে সর্বোচ্চ ১৩০ জনের অবস্থান রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায়।
পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) ১৫টি ব্যাটালিয়নের তথ্য বিশ্লেষণে এসব চিত্র উঠে এসেছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর তৈরি ‘ব্যাটালিয়ন অনুযায়ী আলোচিত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ এবং ছিনতাইকারীর সারসংক্ষেপ’ শীর্ষক নথিতে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। তালিকায় রাজনৈতিক পরিচয়ধারী নেতাদের নামও রয়েছে। তাঁদের কারও কারও বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে একাধিক মামলা রয়েছে।
এসআরবির মহাপরিচালক মো. আহসান হাবীব পলাশ জানান, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে এ তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে তালিকাটি নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়। কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হয়রানি না করে তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনাই এসআরবির লক্ষ্য।
এসআরবির তালিকায় চাঁদাবাজের সংখ্যার দিক থেকে প্রথম অবস্থানে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা এসআরবি-১১ ব্যাটালিয়ন। এ ব্যাটালিয়নের তালিকায় ৫৬৫ জনের নাম রয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চট্টগ্রাম অঞ্চলের এসআরবি-৭ ব্যাটালিয়নের তালিকায় রয়েছেন ৫০৩ জন। এই দুই ব্যাটালিয়নের তালিকায় থাকা ১ হাজার ৬৮ জন দেশজুড়ে চিহ্নিত চাঁদাবাজের প্রায় ৩০ শতাংশ।
এসআরবি-১১-এর আওতায় রয়েছে নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নির্দিষ্ট অংশ, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ফেনী। অন্যদিকে, এসআরবি-৭-এর অধীনে রয়েছে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলা, ফেনী, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজার। ঘন শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক স্থাপনাকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজি মোকাবিলায় এসব অঞ্চলের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
চাঁদাবাজের সংখ্যার দিক থেকে এরপর রয়েছে সিরাজগঞ্জের এসআরবি-১২ ব্যাটালিয়ন, যেখানে ২৭৭ জনের নাম রয়েছে। রাজশাহীর এসআরবি-৫-এ ২১৬ জন, খুলনার এসআরবি-৬-এ ২০০ জন, রংপুরের এসআরবি-১৩-তে ১৮৭ জন, বরিশালের এসআরবি-৮-এ ১৪৯ জন এবং সিলেটের এসআরবি-৯-এ ১২৩ জনের নাম রয়েছে। তালিকায় সবচেয়ে কম চাঁদাবাজ রয়েছেন ময়মনসিংহের এসআরবি-১৪ ব্যাটালিয়নে ৭০ জন এবং কক্সবাজারের এসআরবি-১৫ ব্যাটালিয়নে ৭২ জন।
রাজধানী ও আশপাশের পাঁচটি ব্যাটালিয়নের তালিকায় চাঁদাবাজ হিসেবে ১ হাজার ২৫৪ জনের নাম রয়েছে। এর মধ্যে উত্তরা ও গাজীপুর অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা এসআরবি-১ ব্যাটালিয়নে ৩৯৩ জন এবং মিরপুর অঞ্চলের এসআরবি-৪ ব্যাটালিয়নে ৩৪৭ জন রয়েছেন। এ ছাড়া কেরানীগঞ্জ ও পুরান ঢাকার এসআরবি-১০-এর তালিকায় ২৭৭ জন, তেজগাঁও ও মোহাম্মদপুর এলাকার এসআরবি-২-এর তালিকায় ২১৫ জন এবং শাহজাহানপুর, পল্টন ও রমনা এলাকার এসআরবি-৩-এর তালিকায় ২২ জনের নাম রয়েছে।
আলোচিত সন্ত্রাসীদের তালিকাতেও শীর্ষে রয়েছে নারায়ণগঞ্জের এসআরবি-১১ ব্যাটালিয়ন। এ অঞ্চলে ৪০৮ জনের নাম রয়েছে। এরপর সিরাজগঞ্জের এসআরবি-১২ ব্যাটালিয়নে ৩২৪ জন, চট্টগ্রামের এসআরবি-৭-এ ২৭৭ জন এবং ময়মনসিংহ অঞ্চলে ২৩৯ জনের নাম রয়েছে। রাজশাহীতে ২১৬ জন, খুলনায় ২১৪ জন, সিলেটে ১৯৫ জন এবং কেরানীগঞ্জ অঞ্চলে ১০০ জনের নাম রয়েছে। তবে নথি অনুযায়ী, মালিবাগ, খিলগাঁও, শাহজাহানপুর ও মুগদা এলাকার দায়িত্বে থাকা এসআরবি-৩-এর তালিকায় কোনো আলোচিত সন্ত্রাসীর নাম নেই।
ছিনতাইকারীর তালিকায় থাকা ৫৩৪ জনের সবাই রাজধানী ও আশপাশের পাঁচটি ব্যাটালিয়নের আওতাভুক্ত এলাকায় রয়েছেন। বাকি ১০টি ব্যাটালিয়নের তালিকায় কোনো ছিনতাইকারীর নাম নেই। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকার এসআরবি-২-এর তালিকায় সর্বোচ্চ ১৩০ জন রয়েছেন। মিরপুরের এসআরবি-৪-এ ১১২ জন, কেরানীগঞ্জ ও পুরান ঢাকার এসআরবি-১০-এ ১০৩ জন, শাহজাহানপুর ও পল্টন অঞ্চলের এসআরবি-৩-এ ৯৯ জন এবং উত্তরার এসআরবি-১-এর তালিকায় ৯০ জনের নাম রয়েছে।
শিল্পাঞ্চলে চাঁদাবাজি ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদারের বিষয়ে এসআরবির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে শিল্পাঞ্চলে অভিযান চালিয়ে গত দুই মাসে চাঁদাবাজির মামলায় ২৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সন্ত্রাসী ও ছিনতাইকারী দমনেও নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকবে।
সম্প্রতি চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে বিএনপির দুই নেতাকে আটক করেছে এসআরবি। গত ৫ অক্টোবর খিলক্ষেত থানা বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি শাহিনুর আলম মারফতকে আটকের পর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। একই দিন শেরেবাংলা নগর থানা বিএনপির ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি মিজানুর রহমান স্বপনকে আটক করে থানায় হস্তান্তর করা হয়। শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম জানান, একটি পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে স্বপনকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। এসআরবি সূত্রে জানা গেছে, স্বপনের বিরুদ্ধে স্থানীয় পোশাক কারখানা, নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট, আগারগাঁওয়ের ফুটপাত এবং স্থানীয় বস্তির মাদক কারবারিদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
