কোম্পানি আইনে শেয়ার বাইব্যাকের সুযোগ চায় বিএসইসি

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কোম্পানি আইন-১৯৯৪-এর খসড়া সংশোধনীতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির নিজস্ব শেয়ার কেনার (শেয়ার বাইব্যাক) সুযোগ রাখার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদন ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ, তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির একীভূতকরণ বা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতামত নেওয়া এবং প্রসপেক্টাসে আর্থিক বিবরণী ব্যবহারের সময়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাবও দিয়েছে সংস্থাটি।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর এফবিসিসিআই বোর্ড রুমে কোম্পানি আইন-১৯৯৪-এর খসড়া সংশোধনী নিয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় বিএসইসির পক্ষ থেকে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) সভাটির আয়োজন করে। এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। সভায় বিএসইসির পক্ষে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম বলেন, কোম্পানি আইনকে সময়োপযোগী করতে শুধু বড় ধরনের পরিবর্তন নয়, বিভিন্ন ধারায় কিছু ছোটখাটো সংশোধনও প্রয়োজন। এসব সংশোধন করা হলে আইনটি আধুনিক ব্যবসাব্যবস্থার সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

তিনি বলেন, ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর কোম্পানি আইন সংশোধনের বিষয়ে কিছু প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রস্তাবিত সংশোধনীতে সেসবের কয়েকটি প্রতিফলিত হয়নি। এর মধ্যে কোম্পানির নিজস্ব শেয়ার কেনার সুযোগ বা শেয়ার বাইব্যাকের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। বর্তমান আইনের ৫৮ ধারায় কোম্পানির নিজের শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে অন্তত তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে নিজস্ব শেয়ার কেনার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। কীভাবে এ ব্যবস্থা করা যেতে পারে, সে বিষয়ে আগের প্রস্তাবে বিস্তারিত কাঠামোও দেওয়া হয়েছিল বলে সভায় উল্লেখ করা হয়।

আবুল কালাম বলেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার বাইব্যাকের সুযোগ থাকলে কোম্পানির মূলধন ব্যবস্থাপনা ও শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাই সংশোধনীতে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানাচ্ছি। কোম্পানি আইনের ১৮৩ ধারার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, আইনটির বিভিন্ন পরিভাষাও এখন আধুনিকীকরণের প্রয়োজন রয়েছে। ‘ব্যালান্স শিট’ শব্দটির পরিবর্তে বর্তমানে ‘বার্ষিক আর্থিক বিবরণী’ এবং বোর্ড রিপোর্টের পরিবর্তে অ্যানুয়াল রিপোর্ট ব্যবহারের প্রচলন হয়েছে। তাই আইনের ভাষাও ব্যবসা ও করপোরেট প্রতিবেদনের বর্তমান ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা প্রয়োজন। এ ছাড়া অ্যানুয়াল রিপোর্ট ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রকাশ ও সরবরাহের সুযোগ রাখার প্রস্তাব করেন তিনি। এতে কোম্পানিগুলোর প্রতিবেদন প্রকাশ ও সংশ্লিষ্টদের কাছে তথ্য পৌঁছানো সহজ হবে বলে মত দেন।

সভায় তালিকাভুক্ত কোম্পানির সঙ্গে অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানি একীভূতকরণ (মার্জার), অধিগ্রহণ, ডিমার্জার ও পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় বিএসইসিকে যুক্ত রাখার দাবি জানান সংস্থার এই প্রতিনিধি। তিনি বলেন, কোম্পানি আইনের ২২৮ ও ২২৯ ধারায় এসব বিষয়ে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে একীভূতকরণ বা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে যুক্ত রাখার বিষয়টি রাখা হয়নি। তিনি বলেন, কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির সঙ্গে একীভূত হলে বা এর বিপরীত কোন ঘটনা ঘটলে তালিকাভুক্ত কোম্পানির বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ জড়িত থাকে। তাই এ ধরনের সিদ্ধান্তে নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতামত থাকা প্রয়োজন। ভারতের আইনের আদলে এ ক্ষেত্রে সিকিউরিটিজ নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে (এসইসি) পক্ষ করার প্রস্তাব দেন তিনি।

আবুল কালাম আরও বলেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানির বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়ন্ত্রক সংস্থার। ফলে মার্জার, ডিমার্জার বা পুনর্গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়ার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার আনুষ্ঠানিক ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। এ ছাড়া তফসিল-৩-এ প্রসপেক্টাসে আর্থিক বিবরণী ব্যবহারের সময়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব করেন তিনি। বলেন, বর্তমান কোম্পানি আইনের বিধান অনুযায়ী, কোনো আর্থিক বিবরণী ১৮০ দিনের বেশি পুরোনো হলে তা প্রসপেক্টাসে অন্তর্ভুক্ত করা যায় না। বাস্তবে একটি কোম্পানির আইপিও, রাইট শেয়ার বা বন্ডসহ কোনো ধরনের সিকিউরিটিজ ইস্যুর জন্য আবেদন করতে গেলে নিরীক্ষা ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লাগে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আর্থিক বিবরণী নিরীক্ষা করতেই প্রায় ১২০ দিন সময় লেগে যায়। এরপর আবেদন, অনুমোদন এবং নিবন্ধকের কার্যালয়ে (আরজেএসসি) প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া শেষ করতে ১৮০ দিনের সময়সীমা অতিক্রম করে যায়।

এ কারণে প্রসপেক্টাসে আর্থিক বিবরণী ব্যবহারের সময়সীমা ১৮০ দিন থেকে বাড়িয়ে ২৭০ দিন করার প্রস্তাব করেন বিএসইসির এই প্রতিনিধি। এ বিষয়ে তাদের দেওয়া লিখিত মতামতও বিবেচনায় নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। তিনি মনে করেন, কোম্পানি আইন সংশোধনের মাধ্যমে দেশের করপোরেট খাতের দীর্ঘদিনের কিছু জটিলতা দূর করা সম্ভব। তাই সংশোধনী চূড়ান্ত করার আগে ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর প্রস্তাবগুলো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মত দেন তিনি।

সভায় এফবিসিসিআইয়ের পক্ষে প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেন ব্যারিস্টার নিহাদ কবির। তিনি ৫০ কোটি টাকার বেশি বার্ষিক আয় করা কোম্পানিতে কোম্পানি সচিব নিয়োগের প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, কস্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও কোম্পানি সচিবের মতো সেবা পেশায় নিয়োজিতদের কোম্পানির পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ না রাখার পক্ষে মত দেন। কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আয়োজনের ক্ষেত্রে শেয়ারহোল্ডারদের তারিখ জানানোর পর ন্যূনতম ২১ দিন সময় দিয়ে সভা করার বিধান যুক্ত করার প্রস্তাবও দেন তিনি। এ ছাড়া তালিকাভুক্ত কোম্পানি ছাড়া অন্যান্য পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা রাখার প্রস্তাব করা হয়। পরে সভায় উপস্থিত এক ব্যবসায়ী এজিএমের তারিখ ঘোষণার পর ন্যূনতম ২১ দিন অপেক্ষার সময় কমিয়ে ১৪ দিন করার প্রস্তাব দেন। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমও এ প্রস্তাবে সম্মতি জানান।