অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নীতি ও বাস্তবায়ন বিভাগ পৃথক করার উদ্যোগকে ‘হাফ-বেকড’ বা অসম্পূর্ণ সংস্কার বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, কোনও সংস্কার না থাকার চেয়ে অসম্পূর্ণ সংস্কার বেশি সমস্যা তৈরি করে। সোমবার (১১ মে) রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে দৈনিক বণিক বার্তা আয়োজিত ‘সোনার বাংলা নীতি আলোচনা ২০২৬’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, এনবিআরকে দুই ভাগ করা এখন সময়ের দাবি। তবে করনীতি কারা প্রণয়ন করবেন, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সরকার করনীতিকে কেবল আমলাতান্ত্রিক প্রভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না। শুধু আমলাদের হাতে নীতি নির্ধারণ থাকলে বড় ধরনের সংস্কারের উদ্দেশ্য সফল হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি জানান, এনবিআর সংস্কারসংক্রান্ত বিল বর্তমানে সংসদে আটকে রয়েছে এবং এটি আরও কার্যকর করতে একটি কমিটি কাজ করছে।
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে চলমান প্রায় ১ হাজার ৩০০ প্রকল্পের উপযোগিতা যাচাই করা হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, অতীতে অনেক প্রকল্প ব্যক্তিস্বার্থ ও দুর্নীতির কারণে নেওয়া হয়েছিল, যেগুলোর বাস্তব উপকারিতা খুবই কম। তিনি বলেন, এখন থেকে কেবল জনকল্যাণমূলক ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক প্রকল্প চালু রাখা হবে। নতুন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের রিটার্ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং পরিবেশগত সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
অর্থমন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ বছরে প্রবাসী আয় ৪০ থেকে ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। একই সঙ্গে আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। দুর্নীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরাসরি যোগাযোগনির্ভর প্রশাসনিক ব্যবস্থার কারণে ঘুষের সুযোগ তৈরি হয়। ব্যবসা সহজীকরণের পথে যারা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাদের অপ্রয়োজনীয় করে দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, চুরির আশঙ্কায় নীতিনির্ধারণ থামিয়ে রাখা যাবে না। দুর্নীতি প্রতিরোধের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকেই নিতে হবে।
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক ও এডিবির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। উন্নয়ন সহযোগীদের বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, আইএমএফের সব শর্ত বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য উপযোগী নয়। জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থেকেই সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।
পুঁজিবাজার প্রসঙ্গে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) বড় ধরনের সংস্কার আনা হবে। সেখানে রাজনৈতিক নিয়োগ দেওয়া হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ আর্থিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পেশাদার ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হবে। জ্বালানি খাত নিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আগের সরকারের রেখে যাওয়া ৪০ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকার বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের চাপ বর্তমান সরকার বহন করছে। ইতোমধ্যে জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত চার বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। তিনি জানান, বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় নেপাল থেকে ভারতের গ্রিড ব্যবহার করে ৪ থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়ে আলোচনা চলছে। এছাড়া রাশিয়ার সহায়তায় নির্মাণাধীন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চলতি বছরের মাঝামাঝি প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার আশা করছে সরকার।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি, বিআইডিএসের মহাপরিচালক অধ্যাপক এ কে এনামুল হক, কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান, বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল, এইচএসবিসি বাংলাদেশের সিইও মাহবুব উর রহমান, আইপিডিসির এমডি রিজওয়ান দাউদ সামস এবং শ্রমিক নেত্রী তাসলিমা।
