আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরকে সামনে রেখে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বহির্ভূত উৎস থেকে রাজস্ব আয় বাড়াতে বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বাড়তে থাকা বাজেট চাপ ও উন্নয়ন ব্যয় সামাল দিতে বিকল্প উৎস থেকে আয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা থেকেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগের প্রস্তাব অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে এনবিআরবহির্ভূত খাত থেকে মোট ৯১ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৩৯.৫ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে নন-ট্যাক্স রাজস্বের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬৬ হাজার কোটি টাকা, যা বর্তমানে ৪৬ হাজার কোটি টাকা থেকে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি নির্দেশ করে।
একইভাবে নন-এনবিআর কর আদায়ের লক্ষ্য বাড়িয়ে ২৫ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে, যা চলতি অর্থবছরে ছিল ১৯ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ নন-ট্যাক্স রাজস্বে ৪৩.৪৮ শতাংশ এবং নন-এনবিআর কর আদায়ে ৩১.৫৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সম্প্রতি অর্থ বিভাগ আয়োজিত বাজেট মনিটরিং ও রিসোর্স কমিটির বৈঠকে এই প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। সভায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এনবিআর কর থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, নন-এনবিআর কর থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং নন-ট্যাক্স রাজস্ব থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আহরণের চিত্র খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৯৩ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা, যা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এর মধ্যে এনবিআর কর থেকে আদায় হয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যের মাত্র ৪৯.৮৩ শতাংশ। এ অবস্থায় বাড়তে থাকা পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ের বিপরীতে রাজস্ব আহরণ না বাড়লে সরকারের ঋণনির্ভরতা আরও বাড়তে পারে, ফলে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সংস্কার ও আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা জোরালো হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশকে কর-জিডিপি অনুপাত ৬.৯ শতাংশ থেকে ৯.২১ শতাংশে উন্নীত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, এনবিআর বহির্ভূত রাজস্ব সংগ্রহে দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বলতা রয়েছে। অতীতের তথ্য অনুযায়ী, অনেক সময় নন-ট্যাক্স রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম হয়েছে। একইভাবে নন-এনবিআর কর আদায়ের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি দেখা গেছে। ফলে নতুন উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
সরকারের অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নন-ট্যাক্স রাজস্ব আদায় দীর্ঘদিন ধরেই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ খাতে আদায় হয়েছে লক্ষ্যের মাত্র ৫৫.৬৩ শতাংশ, যেখানে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা ছিল ৭০.৪৭ শতাংশ। একইভাবে, ২০১৬-১৭ ও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এনবিআর বহির্ভূত কর আদায় গড়ে ৮০ শতাংশের বেশি হলেও পরবর্তী সময়ে তা কমে প্রায় ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে বড় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকার বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে রাজস্ব ব্যবস্থায় ডিজিটাল রূপান্তর, কর নেট সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং করবহির্ভূত আয়ের উৎস বাড়ানো। পাশাপাশি ‘এ-চালান’ ব্যবস্থার বাধ্যতামূলক ব্যবহার, ফি ও চার্জ পুনর্নির্ধারণ এবং দীর্ঘদিনের বকেয়া সরকারি পাওনা দ্রুত আদায়ের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাজেট প্রণয়নের অংশ হিসেবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় বৈঠকগুলোতে কঠোর নজরদারি, সম্পদ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং দীর্ঘদিনের বকেয়া সরকারি পাওনা আদায়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে পরিবহন, আবাসন ও অবকাঠামো খাতে, যেখানে রাজস্ব আদায় দুর্বল। খাদ্য মন্ত্রণালয়কে নন-ট্যাক্স রাজস্বের সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে ধরা হয়েছে, যেখানে খাদ্যশস্য বিক্রি থেকে বড় অঙ্কের আয় আশা করা হচ্ছে। একইভাবে সড়ক পরিবহন খাতে টোল ও ফি আদায় বাড়াতে আধুনিক পদ্ধতি চালুর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
নন-ট্যাক্স রাজস্বের প্রধান উৎস হিসেবে লাইসেন্স ফি, জরিমানা, বাজেয়াপ্ত আমানত, বাণিজ্যিক ভবনের ভাড়া, সরকারি যানবাহন ব্যবহারের ফি এবং টেন্ডারসহ বিভিন্ন নথি বিক্রির আয় উল্লেখযোগ্য হলেও এসব খাতে আদায়ের দক্ষতা এখনো সন্তোষজনক নয়। এ অবস্থায় অর্থ বিভাগ এসব উৎস পুনর্মূল্যায়ন, সম্প্রসারণ এবং যৌক্তিক হারে ফি নির্ধারণের সুপারিশ করেছে। অর্থসচিবের মতে, প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়ন হলে রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। এর অংশ হিসেবে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগকে ৬ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে, যদিও সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (আরএইচডি) এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের দুর্বল আদায় সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এ কারণে যানবাহন নিবন্ধন ও ফিটনেস সনদ প্রদানে কঠোরতা বাড়ানো এবং টোল আদায় ব্যবস্থাকে আধুনিক করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের কাছে বকেয়া ১ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা দ্রুত আদায়ের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের জন্য এক হাজার ৪২ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও এ খাতে আদায় কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। এ পরিস্থিতিতে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালু এবং নতুন রাজস্ব উৎস সম্প্রসারণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ভাড়া আয় কমে যাওয়ায় হস্তান্তর ও নামজারি ফি অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ১৮ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে, কারণ সাম্প্রতিক সময়ে এ খাতে আদায় পূর্বাভাস ছাড়িয়ে গেছে। নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য ছোট মন্ত্রণালয়গুলোকে পুরনো ফি কাঠামো হালনাগাদ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সেতু বিভাগে শাসনগত দুর্বলতার বিষয়টিও উঠে এসেছে, যেখানে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার সরকারি ঋণ এখনো বকেয়া রয়েছে এবং কিছু চুক্তি ১৯৯৪ সাল থেকে অমীমাংসিত অবস্থায় রয়েছে।
এ বিষয়ে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘রাজস্ব বাড়াতে কর ও নন-ট্যাক্স উভয় উৎসই সমান গুরুত্ব দিতে হবে এবং এনবিআর বহির্ভূত উৎস থেকে অন্তত এক-চতুর্থাংশ রাজস্ব আসা উচিত।’ তিনি রাজস্ব আহরণে অদক্ষতার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘কম দামে টোল-ভাড়া ইজারা দেওয়ায় সরকার আয় হারাচ্ছে। শুধু করের আওতা বাড়ানো নয়, নন-ট্যাক্স খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করাও জরুরি। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি লোকসানের কারণ খতিয়ে দেখা দরকার।’
