দেশের বাজারে তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফোন, ল্যাপটপ, মনিটর থেকে শুরু করে এসএসডি ও র্যামসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশের দাম গত কয়েক মাসে একাধিক দফায় বেড়েছে। নতুন উইন্ডোজ ও ম্যাক অপারেটিং সিস্টেমে এআই ফিচারের কারণে ১৬ জিবি র্যামকে বাধ্যতামূলক করার ফলে মেমোরির খরচ প্রায় তিন গুণ পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানা গেছে। এআই খাতে বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধির প্রভাব বাংলাদেশসহ বিশ্ববাজারেও পড়েছে, যার ফলে কম্পিউটার ও ল্যাপটপসহ বিভিন্ন আইটি পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। রাজধানীর প্রধান খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও আইটি পণ্যের দামের এই ঊর্ধ্বগতি স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
রাজধানীর মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারে কম্পিউটার কিনতে আসা ক্রেতা জাকির আহমেদ বলেন। তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘মিলিয়ে পিসি বিল্ড করতে এসেছিলাম, কিন্তু বাজারে এসে দেখি প্রতিটি পার্টসের দাম আগের চেয়ে অনেক বেশি। কয়েক মাস আগে যে এসএসডি বা র্যামের দাম শুনে গিয়েছিলাম, এখন তা কয়েক হাজার টাকা বাড়তি। সাধারণ বাজেটের মধ্যে ভালো কনফিগারেশনের পিসি বানানো এখন অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
বাজার ঘুরে দেখা যায়, এইচপি সিরিজ ৫২৪এসএফ (২৩.৮ ইঞ্চি) মনিটরের আগের দাম ১৯ হাজার টাকা থাকলেও বর্তমানে স্টার টেকে ১৯ হাজার ৫০০ এবং ইস্টার্ন আইটিতে ২১ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এলজি ২৭ইউপি৬০০-ডব্লিউ ৪কে মনিটর ৫১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ৫৪ হাজার ৪৯০ টাকা পর্যন্ত ঠেকেছে। লেনোভো ডি১৯-১০ (১৮.৫ ইঞ্চি) মনিটরের দাম ৯ হজার ৬০০ টাকা থেকে বেড়ে ১০ হাজার ৫০০ টাকা হয়েছে।
স্টোরেজ ডিভাইসের বাজারে সবচেয়ে বেশি অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ১ টেরাবাইট কিংস্টন KC3000 এসএসডির দাম ২২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ২৫ হাজার ৩০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। কিংস্টন NV3 ৫০০ জিবি এসএসডি, যা আগে ১১ হাজার টাকায় পাওয়া যেত, বর্তমানে স্টার টেকে ১৪ হাজার ৫০০ টাকা এবং পতাকা আইটিতে ১৩ হাজার ৯৯৯ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে, তোশিবা S300 Pro ৮ টেরাবাইট হার্ডড্রাইভের দাম ৩৩ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৩৪ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। নিট্যাক ৮ জিবি DDR4 র্যামের দাম ৬ হাজার টাকা থেকে একলাফে ৯ হাজার ৪৫০ টাকায় উঠেছে। টিম T-Force Delta ৮ জিবি DDR4 RGB র্যামের দাম ৭ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৯ হাজার ৫০০ টাকা হয়েছে। এছাড়া হাই-পারফরম্যান্স টিম T-Force ১৬ জিবি DDR5 র্যামের দাম ২৯ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ৩১ হাজার ৫০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
ইন্টেল পেন্টিয়াম গোল্ড G6405 প্রসেসরের আগের দাম ৬ হাজার ৯০০ টাকা থাকলেও বর্তমানে আল্ট্রা টেকনোলজিতে তা ৮ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। অ্যাসরক H610M মাদারবোর্ড ৯ হাজার ১০০ টাকা থেকে বেড়ে স্কাইল্যান্ড কম্পিউটারে ৯ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। MSI A520M-A PRO মাদারবোর্ডের দাম ৭ হাজার ৪৯৯ টাকা থেকে বেড়ে ৮ হাজার ৩০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এছাড়া আসুস H81M-K মাদারবোর্ডের দাম ৮ হাজার ৯০০ টাকা থেকে বেড়ে ৯ হাজার ৩০০ টাকা হয়েছে। গ্রাফিক্স কার্ডের বাজারে পেলাডন GT 730 ৪ জিবি মডেলের দাম ৫ হাজার ৩০০ টাকা থেকে বেড়ে ৬ হাজার ২০০ টাকায় পৌঁছেছে। পাওয়ার ব্যাকআপের ক্ষেত্রে লুমিনাস ইকো ওয়াট নিও আইপিএস সেটটির দাম ৪৬ হাজার ৮০০ টাকা থেকে বেড়ে বর্তমানে ৪৮ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সংকটের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল মূলত ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে, যা ২০২৬ সালে এসে এক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে মেমোরি চিপের সংকট এবং এআই প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান চাহিদাই এই অস্থিরতার মূল কারণ। রয়টার্সের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেমোরির খরচ বেড়ে যাওয়ায় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কোম্পানিগুলো ৮ জিবি র্যামের ল্যাপটপকে স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে রাখার চেষ্টা করেছিল। যদিও ইউজারদের চাহিদা ছিল ১৬ জিবি।
রয়টার্স ও সিএনবিসির তথ্যমতে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকেই ডেল ও এইচপির মতো ল্যাপটপ নির্মাতারা উৎপাদন খরচের চাপে সংকটে পড়তে শুরু করে। ব্লুমবার্গের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালকে ‘মেমোরি রিকভারি’র বছর বলা হলেও মূলত স্যামসাং ও মাইক্রন উৎপাদন কমিয়ে দিয়ে চিপের গড় মূল্য ২০২৫ সালেই ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। ২০২৫ সালের প্রথম দুই প্রান্তিকে সার্ভার ড্রামের দাম ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, যা ২০২৬ সালের বর্তমান ভয়াবহ পরিস্থিতির ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল। চিপের উচ্চমূল্যের কারণে স্যামসাং এবং এলজির মতো ব্র্যান্ডগুলো গত তিন মাসে অন্তত দুবার তাদের ল্যাপটপের দাম বাড়িয়েছে। প্রতিটি ল্যাপটপের দাম গড়ে ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। চিপের আকাশছোঁয়া দামের কারণে ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী পিসি ও স্মার্টফোন শিপমেন্ট ৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাবে বলে গবেষণা সংস্থা গার্টনার সতর্ক করেছে।
সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বিপুল পরিমাণ পণ্য একসঙ্গে কেনার উপযোগী বাজেট ব্যবস্থাপনায় জোর দেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি আলমাস। তিনি বলেন, ‘প্ল্যানটা এমনভাবে করা উচিত যেন আমরা বাল্কে অনেকগুলো প্রোডাক্ট একসাথে কিনতে পারি। তাহলে ম্যানুফ্যাকচারাররা আমাদের ভালো প্রাইস দিতে পারবে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে এবং সেখানে স্পেসিফিকেশন পরিবর্তনের সুযোগ রাখতে হবে। কারণ টেন্ডার করার ছয় মাস পর ওই স্পেসিফিকেশনের পণ্য নাও পাওয়া যেতে পারে।’
চিপ উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান নিওন গ্যাসের বৈশ্বিক সরবরাহ এখনো ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। পাশাপাশি চীন গ্যালিয়াম ও জার্মেনিয়ামের মতো সেমিকন্ডাক্টর তৈরির কাঁচামাল রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করায় ২০২৬ সালে চিপ উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে লোহিত সাগরে অস্থির পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক শিপিং রুটে ঝুঁকি বেড়েছে, ফলে চিপ পরিবহনের বীমা ও শিপিং খরচ গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। একইসঙ্গে পুরোনো যন্ত্রপাতির যন্ত্রাংশ সংকট এবং বড় কোম্পানিগুলোর উন্নত ন্যানোমিটার প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনের দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণে সাধারণ চিপ উৎপাদনের খরচ আরও বেড়ে গেছে।
টেকওয়্যার এশিয়া এবং ওমডিয়ার গবেষণা বলছে, ২০২৬ সালের এই সংকট কেবল শুরু। সরবরাহ এবং চাহিদার এই বিশাল ব্যবধান ২০২৭ সাল পর্যন্ত গড়াতে পারে। কারণ টিএসএমসির অ্যারিজোনা প্ল্যান্ট বা স্যামসাংয়ের নতুন টেক্সাস প্ল্যান্টগুলো ২০২৭ সালের আগে পূর্ণ উৎপাদনে যেতে পারবে না। বাংলাদেশে ডলারের বিনিময় হারের অস্থিরতা এবং এলসি খোলার জটিলতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে চিপের দাম ২০ শতাংশ বাড়লে, স্থানীয় শুল্ক ও ডলারের কারণে বাংলাদেশে ভোক্তা পর্যায়ে সেই দাম ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বেড়ে যাচ্ছে।
