আল-আরাফাহ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

২০১৮ সালে মতিঝিল থানায় আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান বদিউর রহমানের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, অবৈধভাবে ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা সিঙ্গাপুরে পাচার করে তিনি এমএস এরিয়াল মেরিটাইম লিমিটেডে বিনিয়োগ করেন। দীর্ঘদিন স্থবির থাকা এ মামলার অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে নতুন করে তদন্তে প্রয়োজনীয় নথিপত্র তলব করেছে দুদক।

দুদকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) তানজীর আহমেদ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান বদিউর রহমানের বিরুদ্ধে সিঙ্গাপুরে অর্থ পাচারের মাধ্যমে কোম্পানি প্রতিষ্ঠার অভিযোগে করা মামলার তদন্তের স্বার্থে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি তলব করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আগামী ১০ আগস্টের মধ্যে সাত ধরনের নথি দুদক বরাবর পাঠাতে বলা হয়েছে। কপিগুলো পেলে তদন্ত কর্মকর্তা পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।’

দুদকের চিঠিতে বদিউর রহমানের আয়কর নথি, সিঙ্গাপুরে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির শেয়ার সংক্রান্ত তথ্য এবং ব্যাংকে দাখিল করা আয়কর রিটার্নের কপি চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২০০৩ সালে নিবন্ধিত অ্যারিয়েল মেরিটাইম কোম্পানির প্রতিষ্ঠা, মূলধন জোগান ও বিনিয়োগের বৈধতার প্রমাণ, প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ২০০৩-০৬ অর্থবছর পর্যন্ত শেয়ার সনদপত্রও তলব করা হয়েছে। এছাড়া কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা ৫ লাখ সিঙ্গাপুরি ডলার পরিশোধের ব্যাংকিং প্রমাণ, মূলধন জমার হিসাব বিবরণী এবং ২০০৩ থেকে ২০০৬ অর্থবছর পর্যন্ত আইআরএএস-এ জমা দেওয়া আয়কর বিবরণীসহ শেয়ারের বিপরীতে ইস্যুকৃত সনদের কপিও দিতে বলা হয়েছে।

এদিকে আল-আরাফাহ ব্যাংকে নিয়োগে অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি, বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতির অভিযোগে ব্যাংকটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাফাত উল্লাহ খানসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। গত ১ মার্চ পাঠানো পৃথক আরেক চিঠিতে অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথিপত্র সরবরাহ করতে ব্যাংকটির কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি। দুদকের চিঠিতে বলা হয়, ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরমান আর চৌধুরী এবং বর্তমান এমডি মো. রাফাত উল্লাহ খানের বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতি, দুর্নীতি, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে অনিয়ম, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সুদ মওকুফ এবং ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ বিতরণের অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানের স্বার্থে ব্যাংকটির কাছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথি ও তথ্য চাওয়া হয়েছে।

দুদক চিঠিতে উল্লেখ করেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ব্যাংকটিতে বিভিন্ন পদে নিয়োগ-সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য দিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যাডিশনাল এমডি, তিনজন এসইভিপি, পাঁচজন ইভিপি, ৯ জন এসভিপি, ১১ জন ভিপি, ৯ জন এসএভিপি, ১২ জন এভিপি, ৯ জন এফএভিপি, চারজন সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার, ১১ জন প্রিন্সিপাল অফিসার, দুজন সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার, দুজন এক্সিকিউটিভ অফিসার এবং ১৮ জন ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি অফিসার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি, আবেদনপত্র, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার খাতা, নম্বরশিট এবং ফলাফলের ট্যাবুলেশন শিট। এসব নিয়োগে পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তের কপিও দিতে বলা হয়েছে।

এছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত যেসব প্রতিষ্ঠানের সুদ মওকুফ করা হয়েছে, তাদের তালিকা ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, ঋণ বিতরণ ও আদায় সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং বোর্ড রেজুলেশনের কপিও তলব করেছে দুদক। একই সঙ্গে একটি টি-২০ ক্রিকেট লিগে ব্যাংকের স্পন্সরশিপ সংক্রান্ত নথি এবং ডিএমডি মোহাম্মদ হোসেনের ব্যক্তিগত কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। বর্তমান এমডি মো. রাফাত উল্লাহ খানের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে নিয়োগ নীতিমালা, বিজ্ঞপ্তি, বোর্ডের সিদ্ধান্ত, বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো প্রার্থীদের তালিকা, আবেদনপত্র, নিয়োগ ও যোগদানপত্র, শিক্ষাগত ও অভিজ্ঞতার সনদ এবং জীবনবৃত্তান্ত। পাশাপাশি ২০২৫ সালে অডিট ফার্ম নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্রও চাওয়া হয়েছে।

এছাড়া এমডি রাফাত উল্লাহ খানের দায়িত্বকালে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের কর বাবদ জমা দেওয়া ৬৮ কোটি টাকা কোন উৎস থেকে পরিশোধ করা হয়েছে, সে সম্পর্কিত নথিও চেয়েছে দুদক। একই সঙ্গে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বিতরণ করা ঋণের বিস্তারিত তথ্যও তলব করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঋণের হিসাব নম্বর, আবেদনকারীর নাম ও পদবি, ঋণের পরিমাণ, অনুমোদন ও বিতরণের তারিখ, মোট পরিশোধিত অর্থ, বর্তমান বকেয়া, ঋণের মেয়াদ এবং ঋণের বর্তমান অবস্থা (শ্রেণিকৃত বা অশ্রেণীকৃত) সংক্রান্ত তথ্য।

এদিকে ব্যাংকটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরমান আর চৌধুরীর বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুদক। তার বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতি, অনৈতিকভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সুদ মওকুফ এবং নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে সম্প্রতি দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-২ থেকে ব্যাংকটিকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন পদে নিয়োগ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।