আকিজ সিমেন্টের ১৪৮ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি-অবৈধ রেয়াত

** ২০২১-২২ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছর আকিজ সিমেন্ট প্রায় ৭১ কোটি ১৬ লাখ টাকা অবৈধ রেয়াত নিয়েছে
** ২০২১-২২ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর আকিজ সিমেন্ট প্রায় ৭৯ কোটি ৯৫ লাখ ভ্যাট পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে
** বিক্রির তথ্য সঠিকভাবে রিটার্ন দেখানো হয়নি, যেসব খাতে রেয়াত হবে না-সেসব খাতেও রেয়াত নেয়া হয়েছে

একাধিক খাতে নেয়া হয়েছে অবৈধ রেয়াত। কখনো উপকরণ নয়-এমন খাতে নেয়া হয়েছে রেয়াত। আবার কখনো উপকরণের অতিরিক্ত ব্যবহার দেখিয়ে রেয়াত নেয়া হয়েছে। কখনো উপকরণ-উৎপাদ সহগ দাখিল না করেও নেয়া হয়েছে রেয়াত। আবার কখনো ‘ট্রেড অ্যান্ড পে-এবল’ খাতে বিধি বর্হিভূত নেয়া হয়েছে রেয়াত। ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত কয়েকটি খাতে প্রায় ৭১ কোটি ১৬ লাখ টাকা অবৈধ রেয়াত নেয়া হয়েছে। শুধু অবৈধ রেয়াত নেয়, সিমেন্ট বিক্রির উপর সঠিকভাবে ভ্যাট দেয়া হয়নি। এমনকি কিছু কিছু বিক্রির তথ্য ভ্যাট রিটার্নেও দেখানো হয়নি। এছাড়া কেনাকাটা বা ব্যয়ের উপর সঠিকভাবে উৎসে কর কর্তন করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ৭৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ভ্যাট পরিশোধ না করে ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। আকিজ গ্রুপের আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের বিরুদ্ধে প্রায় ১৪৮ কোটি টাকার অবৈধ রেয়াত ও ভ্যাট ফাঁকির প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতাধীণ বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ)-মূল্য সংযোজন কর (মূসক)। এলটিইউর নিরীক্ষায় এই অবৈধ রেয়াত ও ভ্যাট ফাঁকি উদ্ঘাটিত হয়েছে। এনবিআর সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

এনবিআর সূত্রমতে, ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের নিরীক্ষা করতে নিরীক্ষা দল গঠন করে এলটিইউ। দলের সদস্যরা ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত নিরীক্ষা করতে প্রতিষ্ঠানের বিক্রি, ব্যয়, ভ্যাট সংক্রান্ত কাগজপত্র ও বার্ষিক প্রতিবেদন সংগ্রহ করে যাচাই করেন। যাতে অবৈধ রেয়াত ও ভ্যাট ফাঁকির তথ্য উঠে আসে। কাগজপত্র যাচাই শেষে চলতি বছরের ২৮ জুন নিরীক্ষা দল প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানকে দাবিনামা সম্বলিত কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়েছে।

৭১.১৬ কোটি টাকার অবৈধ রেয়াত

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১-২২ অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আকিজ সিমেন্টের লাইমস্টোন ৪৩ কোটি ৭৩ লাখ ৯৭ হাজার ৩৫৪ কেজি, স্লাগ ২ কোটি ৭২ লাখ ৮১ হাজার ৮২৫ কেজি ও পিপি ওভেন ২৭ লাখ ৭৭ হাজার ২৫২ কেজি সমাপনী মজুদ দেখানো হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছর ক্রয় হিসাব পুস্তকের প্রারম্ভিক মজুদে প্রদর্শিত লাইমস্টোন ৪৩ কোটি ৫৭ লাখ ১৬ হাজার ৯৯৫ কেজি, স্লাগ ২ কোটি ৭২ লাখ ৫ হাজার ১০০ কেজি ও পিপি ওভেন ব্যাগ ২৪ লাখ ৩৫ হাজার ২৬৩ কেজি। ২০২২-২৩ অর্থবছর প্রতিষ্ঠানটি ১৬ লাখ ৮০ হাজার ৩৫৮ কেজি লাইমস্টোন, ৭৬ হাজার ৭২৪ কেজি স্লাগ ও ৩ লাখ ৪১ হাজার ৯৮৮ কেজি পিপি ওভেন ব্যাগ প্রদর্শন করেনি। ২০২১-২২ অর্থবছরের মূসক-৬.১ (মূল্য ঘোষণা) অনুযায়ী, প্রতি কেজি লাইমস্টোন ২ টাকা ৫২ পয়সা, স্লাগ ৭ টাকা ৩৬ পয়সা ও পিপি ওভেন ব্যাগ ৪১ টাকা ৫৬ টাকা ঘোষণা করা হয়েছে। যেহেতু ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রারম্ভিক মজুদে প্রদর্শিত লাইমস্টোন, স্লাগ ও ওভেন ব্যাগ ২০২১-২২ অর্থবছরে নিরীক্ষা প্রতিবেদনের সাথে আড়াআড়ি যাচাইয়ের মাধ্যমে উদ্ঘাটিত, সেহেতু ২০২১-২২ অর্থবছরে মূসক-৬.১ অনুযায়ী প্রতি কেজি লাইমস্টোন, স্লাগ ও পিপি ওভেন ব্যাহের ক্রয় মূল্যকে ভিত্তি হিসেবে বিচেনা করে অপ্রদর্শিত উপকরণসমূহের ক্রয়মূল্য হিসাব করা হয়েছে। অপ্রদর্শিত লাইমস্টোন, স্লাগ ও পিপি ওভেন ব্যাগের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি মোট ২৮ লাখ ৫২ হাজার ৯১০ টাকা অবৈধ রেয়াত গ্রহণ করেছে। অপরদিকে, আকিজ সিমেন্ট ২০২২-২৩ অর্থবছর উপকরণ নয় এমন ৬০ কোটি ৭৪ লাখ ৭১ হাজার ৭১৭ টাকার পণ্য বা সেবার বিপরীতে ৮ কোটি ৭১ লাখ ৬০ হাজার ৭৮৫ টাকা অবৈধভাবে রেয়াত গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে ৪৬ কোটি ৩১ লাখ ১৫ হাজার ৪৯৩ টাকার ক্র্যাশ স্টোনের বিপরীতে ৬ কোটি ৯৪ লাখ ৬৭ হাজার ৩২৪ টাকা, ৪৪ লাখ ৫৮ হাজার ৪৩৬ টাকার বিপরীতে ৬ লাখ ৬৮ হাজার ৭৬৫ টাকা, ১৩ কোটি ৮৭ লাখ ৯০ হাজার ৩৪৫ টাকার স্পেয়ার পার্টসের বিপরীতে ১ কোটি ৬৮ লাখ ৫৮ হাজার ৫৭৯ টাকা ও ১১ লাখ ৭ হাজার ৪৪২ টাকার অক্সিজেনের বিপরীতে ১ লাখ ৬৬ হাজার ১১৬ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছর ১১ কোটি ৩৩ লাখ ৬ হাজার ৭৬৮ টাকার অক্সিজেন, বিজ্ঞাপন ও স্পেয়ার পার্টসের বিপরীতে ১ কোটি ৪৭ লাখ ৫৭ হাজার ৮৬১ টাকা অবৈধভাবে রেয়াত নেয়া হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছর অতিরিক্ত ৬ কোটি ৬০ লাখ ৯০ হাজার ৭১৩ টাকার ক্লিংকার, জিপসাম, লাইমস্টোন ও পলিব্যাগ অতিরিক্ত ব্যবহার করে ৯৯ লাখ ১৩ হাজার ৬০৭ টাকা অবৈধ রেয়াত গ্রহণ করেছে। একইভাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছর ৩ কোটি ২০ লাখ ৫৮ হাজার ৮৯৫ টাকার অতিরিক্ত ক্লিংকার, গ্রানুলেটেড ব্লাস্ট ফার্নেস স্লাগ ও পলিব্যাগ ব্যবহৃত উপকরণের উপর অবৈধভাবে ৪৮ লাখ ৮ হাজার ৮৩৪ টাকা অবৈধ রেয়াত গ্রহণ করেছে।

অপরদিকে, নিরীক্ষা দল প্রতিষ্ঠানটির উপকরণ-উৎপাদ সহগ ও দাখিলপত্র (ভ্যাট রিটার্ন) যাচাই করেছে। যাতে দেখা গেছে, আকিজ সিমেন্ট ২০২২-২৩ অর্থবছর ৩০ কোটি ৪১ লাখ ৪ হাজার ২৭৭ টাকা উপকরণের বিপরীতে ১৮ কোটি ১১ লাখ ৭৭ হাজার ৯১৬ টাকা অবৈধ রেয়াত গ্রহণ করেছে। যার মধ্যে লুব অয়েল, ফিরোসফেট, ডরটিক মেরিন, বিয়ারিং, মাইক্রোসিলিক ও ওয়েলডিং রডে প্রায় সাড়ে ১৬ লাখ টাকা, বিদ্যুৎ প্রায় ৪৯ লাখ টাকা, গ্যাস প্রায় ৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা, ক্যাপিটাল মেশিনারিজ বা খুচরা যন্ত্রাংশ প্রায় ৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, ফুয়েল প্রায় ৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। একইভাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছর ৩২ কোটি ২৪ লাখ ৯৭ হাজার ৭৮৪ টাকা একই ধরনের উপকরণের বিপরীতে ২১ কোটি ৩৮ লাখ ৮ হাজার ৯৮ টাকা অবৈধ রেয়াত নেয়া হয়েছে। অপরদিকে, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছর নতুন উপকরণ উৎপাদ সহগ ছাড়াই আকিজ সিমেন্ট মোট ১৩ কোটি ৩৪ লাখ ৯১ হাজার ৩৮৭ টাকা ও ৭৬ হাজার ৬৯১ টাকা অবৈধ রেয়াত নিয়েছে, যা বাতিলযোগ্য। মূলত আকিজ ব্র্যান্ডের সিমেন্ট ব্যাগের বিপরীতে এই রেয়াত নেয়া হয়েছে। এছাড়া ‘ট্রেড অ্যান্ড আদার পে-এবল’ খাতে প্রতিষ্ঠানটি ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছর ৩ কোটি ৮৮ লাখ ৩৮ হাজার ৬৭৮ টাকা ও ২ কোটি ৪৭ লাখ ৫২ হাজার ৭০ টাকা অবৈধ রেয়াত নিয়েছে। ২০২১-২২ থেকে ২০২৩-২৪ পর্যন্ত আকিজ সিমেন্ট মোট ৭১ কোটি ১৬ লাখ ৩৮ হাজার ৮৩৭ টাকা অবৈধ রেয়াত গ্রহণ করেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

৭৬.৯৫ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আকিজ সিমেন্টের সিএ রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছর বেতন ও মজুরি, অবচয় ও মুনাফা খাতে ১২৪ কোটি ১০ লাখ ৬১ হাজার ৫৪৬ টাকার বিপরীতে ১৮ কোটি ৬১ লাখ ৫৯ হাজার ২৩১ টাকা ভ্যাট দেয়নি। প্রতিষ্ঠানের মূসক-৪.৩ অনুযায়ী এই খরচ দেখানো হয়েছে। একইভাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছর ১৩০ কোটি ৪৭ লাখ ৫২ হাজার ৬৭৪ টাকার বিপরীতে ১৯ কোটি ৫৭ লাখ ১২ হাজার ৯০০ টাকা ভ্যাট দেয়নি। অপরদিকে, প্রতিষ্ঠানটি ২০২২-২৩ অর্থবছর প্রতিষ্ঠানটি আকিজ ব্র্যান্ড কম্পোজিট সিমেন্ট প্রতি ৫০ কেজির ৩ লাখ ৪২ হাজার ৩৩০ পিস সিমেন্ট উৎপাদন করলেও এসব ব্যাগ দেখানো হয়নি, যাতে ১৫ শতাংশ হারে ১ কোটি ৫০ লাখ ৬২ হাজার ৩৪৯ টাকা ভ্যাট পরিশোধ না করে ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের সিএ রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছর প্রতিষ্ঠানটি ৭৪ কোটি ৮২ লাখ ৭৪ হাজার ৭৩৮ টাকার পণ্য বা সিমেন্ট সরবরাহ করলেও ১৫ শতাংশ হারে ১১ কোটি ২২ লাখ ৪১ হাজার ২১০ টাকা ভ্যাট পরিশোধ করেনি, যা ফাঁকি দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির এই বিক্রি ভ্যাট রিটার্নে দেখানো হয়নি। একইভাবে সিএ রিপোর্ট অনুযায়ী, ট্রেড রিসিভ-এবল খাতে প্রতিষ্ঠানটি ১২৯ কোটি ৯৬ লাখ ৩৭ হাজার ৩১৯ টাকার উপর কোন ভ্যাট দেয়নি। এটার কোন প্রমাণ প্রতিষ্ঠান দেখাতে পারেনি। অর্থাৎ বিক্রির তথ্য ভ্যাট রিটার্নে দেখানো হয়নি। যার উপর ১৫ শতাংশ হারে প্রযোজ্য ভ্যাট ১৬ কোটি ৯৫ লাখ ১৭ হাজার ৯১১ টাকা, যা প্রতিষ্ঠান পরিশোধ করেনি। ২০২২-২৩ অর্থবছর আকিজ সিমেন্ট ‘অ্যাডভান্স এগিনিস্ট পার্সেজ অ্যান্ড এক্সপেন্স’ খাতে ২৬ কোটি ৮৮ লাখ ১৯ হাজার ৭১৭ টাকার উপর ১ কোটি ৮৭ লাখ ৫৪ হাজার ৮৬৩ টাকা এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছর ৮২ কোটি ১৯ লাখ ২৮ হাজার ২৫৩ টাকার বিপরীতে ৫ কোটি ৭৩ লাখ ৪৩ হাজার ৮৩১ টাকা উৎসে ভ্যাট দেয়নি। একইভাবে ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছর প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন ব্যয় বা কেনাকাটার উপর ১ কোটি ৪৭ লাখ ৯২ হাজার ৩৭২ টাকা উৎসে ভ্যাট কর্তন করে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়নি। ২০২১-২২ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত আকিজ সিমেন্ট মোট ৭৯ কোটি ৯৫ লাখ ৮৪ হাজার ৬৬৭ টাকা ভ্যাট পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে আকিজ গ্রুপের চেয়ারম্যান এস কে নাসির উদ্দিনকে ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। বক্তব্যের বিষয় হোয়াটসঅ্যাপে দেওয়া হলেও তিনি জবাব দেননি। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ জসিম উদ্দিনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। আকিজ রিসোর্ট ও আকিজ সিমেন্টের চিফ বিজনেস ডেভেলপমেন্ট অফিসার তৌফিক হাসান বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের থেকে খোঁজ নিয়ে জানাতে হবে। এই বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন সদস্য বলেন, রেয়াত নেয়াত বৈধ। কিন্তু আকিজ সিমেন্ট রেয়াতের নয়-ছয় করেছে। ব্যবস্থা নেয়া উচিত।