আওয়ামী লীগ সরকারকে ‘অনির্বাচিত’ বর্ণনা করে সেই সময় আইএমএফের সঙ্গে করা ঋণচুক্তির শর্ত বর্তমান ‘নির্বাচিত’ সরকারের কাছে ‘গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে’ বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, এ ঋণ কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর নতুন করে আইএমএফের কী চুক্তি করা হবে এবং সে চুক্তির আওতায় কী শর্ত মেনে নেওয়া হবে তা ‘জনগণের স্বার্থ বিবেচনায়’ সিদ্ধান্ত নেবে বিএনপি সরকার। আইএমএফ-বিশ্ব ব্যাংকের বসন্তকালীন সভায় অংশগ্রহণ শেষে রোববার দেশে ফিরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হয়, আইএমএফের ঋণের পরবর্তী কিস্তির অর্থ আগামী জুন-জুলাইয়ের মধ্যে মিলবে কি না। জবাবে আমির খসরু মাহমুদ বলেন, “জুন-জুলাই কোনো বিষয় না। এগুলো হচ্ছে আইএমএফের -এর সাথে যে প্রোগ্রামটা, শুরু হয়েছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের, এটা তো মাথায় রাখতে হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে আইএমএফের এই প্রোগ্রামটা নেওয়া হয়েছে। এখানে অনেক ধরনের শর্ত ওখানে দেওয়া আছে। এর মধ্যে অনেকগুলো শর্ত তো আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে, তাই না? তখন একটা অনির্বাচিত সরকারের অধীনে এই প্রোগ্রামটা নেওয়া হয়েছে। মাথায় রাখতে হবে এটা নির্বাচিত সরকার।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সুতরাং আমরা যে শর্তগুলো গ্রহণ করব, সেটা জনগণের যদি কোনো ধরনের স্বার্থ সংরক্ষণে বাধাগ্রস্ত হয়, সেই সিদ্ধান্ত তো আমরা নির্বাচিত সরকার নেব না। এটা এই প্রোগ্রামটা আওয়ামী লীগের সময়ের। এবং এই প্রগ্রামটা ৬-৭ মাস পরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। এরপরে আমরা এই প্রগ্রামের ফারদার কী হবে, এটাও সিদ্ধান্ত আমরা নেব। এই সিদ্ধান্ত কিন্তু আমাদের। আমরা কি ফারদার প্রগ্রামে যাব কি, যাব না—এটা আমাদের সিদ্ধান্ত। আমির খসরু বলেন, আইএমএফের চলমান ঋণের বিষয়ে আরো আলোচনা হবে।
আলোচনা চলছে, যতক্ষণ আলোচনা শেষ না হবে আগামী ১৫-২০ দিন, আরও এক মাস আলোচনা হতে পারে। এরপরে আলোচনা যেখানে গিয়ে দাঁড়ায়, আমরা সিদ্ধান্ত নেব। আমরা সিদ্ধান্ত নেব নেক্সট স্টেপ কোথায় যাবে। এটা আমাদের সিদ্ধান্ত। আইএমএফের অনেক শর্তের সঙ্গে বর্তমান সরকার একমত নয় বলে জানান তিনি। মতভেদ হওয়া শর্তের মধ্যে কী কী রয়েছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী বলেন, এটা তো আমি আলোচনা করব না। এটা পাবলিকলি আলোচনা করতে পারব না। আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এটা বলা যাবে না। আলোচনা শেষ হয়ে যাওয়ার পরে আমি বলতে পারব।
তিনি বলেন, আমরা জনগণের কাছে ওয়াদাবদ্ধ, অনেক কিছু প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এখানে আমাদের জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণের বাইরে গিয়ে আমরা তো কোনো কিছু নেবও না, দেবও না। এটা দুই পক্ষেরই ব্যাপার। ওরা দেবে না, আমি নেব—বিষয়টা কিন্তু দুই পক্ষেরই ব্যাপার, মিউচুয়াল ব্যাপার। এখানে কেউ কোনো চ্যারিটি নাই- এগুলো। দিস আর বিজনেস ট্রানজ্যাকশনস, এটা মাথায় রাখতে হবে। ওদের সাথে আমাদের সম্পর্ক; আলোচনা চলছে, আলোচনা এখনও শেষ হয়নি। আরও ১৫ দিন, আরও ২০ দিন চলতে পারে—বিশেষ করে আইএমএফ-এর সাথে। অন্যান্য সহযোগী সংস্থা থেকে ঋণ নেওয়া প্রসঙ্গে আমির খসরু বলেন, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সাথে আমাদের মোটামুটি আলোচনা যেগুলো হয়েছে, এক ধরনের হয়েই গেছে। অলমোস্ট শেষের দিকে। এডিবির সাথে হয়ে গেছে। ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল ব্যাংক—ওদের সাথেও হয়ে গেছে। আইএমএফের সাথে যে বিষয়গুলো পেন্ডিং আছে, এগুলো আলোচনা চলছে এখন। আলোচনা শেষ হয়নি। এবং আলোচনায় যে বিষয়গুলো এখনও পুরোপুরিভাবে আমরা একমত হতে পারিনি—যে শর্তগুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, এগুলো চলছে আলোচনা।
আইএমএফের অন্যতম একটি শর্ত ছিল জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতে ভর্তুকি কমিয়ে দর বাজারভিত্তিক করা। এর মধ্যে শনিবার সন্ধ্যায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দেয় সরকার।আইএমএফের কারণে তেলের দর বাড়ানো হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী বলেন, এটা কিন্তু আইএমএফের শর্তের কারণে বাড়ানো হয়নি। এটা তো- অটোমেটিক প্রাইসিংয়ের দিকে আমরা যাচ্ছি। আমাদের যে পলিসি, সেই পলিসির ভিত্তিতেই তেলের দামটা বাড়ানো হয়েছে। এটার সাথে আইএমএফের শর্তের কোনো সম্পর্ক নেই। এবং আপনারা জানেন যে, বিশ্ববাজারেও তেলের দাম এখন অনেক বেশি। সুতরাং আমাদের সেই অ্যাডজাস্টমেন্টটা করতে হয়েছে। এবং এটা একটা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে করা হয়েছে। এখানে কিন্তু লুকোচুরির কিছু নেই।
আইএমএফ-বিশ্ব ব্যাংকের বসন্তকালীন সভায় অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকারের একটি প্রতিনিধি দল বিভিন্ন বৈঠকে অংশ নেয়। এর মধ্যেই খবর আসে, রাজস্ব খাত ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কার কার্যক্রমে সংস্থাটির শর্ত পূরণ না হওয়ায় পরবর্তী কিস্তি স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইএমএফ। একই সঙ্গে নতুন কর্মসূচির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে নতুন কোনো আরও কঠোর শর্তের বেড়াজালে পড়ার শঙ্কার কথা তুলে ধরে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম। তবে বসন্তকালীন সভার চতুর্থ দিন শুক্রবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু ওয়াশিংটনে বলেছেছিলেন, বিশ্ব ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) অর্থায়ন ও ঋণ কর্মসূচি চালিয়ে যেতে ‘খুবই ইতিবাচক’ মনোভাবে রয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আর্থিক সংকট সামাল দিতে ২০২২ সালে কয়েক দফা আলোচনা শেষে পরের বছরের প্রথম দিকে আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি করে বাংলাদেশ। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের জুনে ঋণের অর্থ ৮০ কোটি ডলার বাড়িয়ে নিলে আকার ৫৫০ কোটি ডলার হয়। পাঁচ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলারের ঋণ পেয়েছে বাংলাদেশ। বাকি আছে ১৮৬ কোটি ডলার। ষষ্ঠ কিস্তি ও অবশিষ্ট অর্থ ছাড়ের সময় ছিল গত বছরের ডিসেম্বরে। তখন আইএমএফ জানিয়ে দেয়, ঋণের অবশিষ্ঠ অর্থ ছাড় করা হবে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে। সেই অর্থ ছাড় করার আগে ঋণের শর্ত বাস্তবায়নে অগ্রগতি দেখতে চায় আইএমএফ। অন্যদিকে অর্থনীতির বিদ্যমান বাস্তবতা, আসন্ন বাজেট, যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলা—এসব কারণে বাজেট–সহায়তা হিসেবে অন্তত ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের চাহিদা রয়েছে বাংলাদেশের। এবারের আইএমএফ-বিশ্ব ব্যাংক বৈঠকে সে বিষয়েও আলোচনা হয়।
