অবৈধ আমদানির চাপে ঝুঁকিতে দেশি ফাসেনার শিল্প

দেশে নাট-বোল্ট-স্ক্রুর উৎপাদন বাড়লেও শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আমদানি করা সস্তা বিদেশি পণ্যের চাপে পড়েছে স্থানীয় শিল্প। আকিজ, আরএফএল, মেঘনা, ওয়ালটন, সুপার স্টার ও বিএসআরএমসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এ খাতে বিনিয়োগ করলেও অবৈধ আমদানির কারণে এসব বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়ছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা। তাদের অভিযোগ, প্রকৃত এইচএস কোড পরিবর্তন, কম মূল্য ঘোষণা, ভুল বা মিথ্যা ঘোষণা এবং সীমান্তপথে চোরাচালানের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ নাট-বোল্ট-স্ক্রু দেশে ঢুকছে। এতে সরকার বিপুল রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি বৈধ আমদানিকারক ও দেশীয় উৎপাদকরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্র জানায়, সম্প্রতি ইউনিস্টার টেক্সটাইলের সেকেন্ডহ্যান্ড পাওয়ার লুমের চালানে ঘোষণার আড়ালে বিভিন্ন পণ্য আমদানির ঘটনায় প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং এম এ টেক্সটাইলের মেশিনারিজের আড়ালে ইলেকট্রিক স্কুটি, নাট-বোল্ট ও সি-সল্ট আমদানির ঘটনায় ৯১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এইচএস কোড ৭৩১৮.১৯.০০-এর আওতায় ফাসেনার আমদানিতে ২৫ শতাংশ কাস্টমস ডিউটি, ৩ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি, ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ৫ শতাংশ এআইটি এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এটিভি রয়েছে। আমদানি করা প্রতি কেজি স্ক্রুর ন্যূনতম ক্রয়মূল্য ২ থেকে ২ দশমিক ৫ মার্কিন ডলার। রাজধানীর নবাবপুরের পাইকারি বাজারে দেখা গেছে, চীন থেকে আমদানি করা নাট-বোল্ট-স্ক্রু প্রতি কেজি ১৭০-১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ বৈধভাবে শুল্ক-কর দিয়ে আমদানি করা পণ্যের দাম হওয়ার কথা ৩০০ টাকার বেশি। ফলে কর ফাঁকি দিয়ে আসা পণ্য বৈধ আমদানিকারক ও স্থানীয় উৎপাদকদের দামের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনিয়মের প্রধান তিনটি ধরন হলো— কম শুল্কের এইচএস কোডে পণ্য ঘোষণা, প্রকৃত মূল্য কম দেখানো এবং শুল্ক না দিয়ে সীমান্তপথে পণ্য আনা। পাশাপাশি এক ধরনের ফাসেনারকে অন্য পণ্য হিসেবেও ঘোষণার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় শিল্পে কারখানা স্থাপন, আধুনিক যন্ত্রপাতি, ডাই-মোল্ড, কাঁচামাল, বিদ্যুৎ-গ্যাস, দক্ষ জনবল, মান নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণায় বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এরই মধ্যে এসব খাতে বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু অস্বাভাবিক কম দামে অবৈধ পণ্য বাজারে আসায় এসব বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়ছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে এবং বিদ্যমান কারখানাগুলো উৎপাদন কমাতে বা বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে। এর প্রভাব শুধু ফাসেনার শিল্পে নয়, ডাই-মোল্ড, মেশিনিং, হিট ট্রিটমেন্ট, সারফেস ফিনিশিং, প্যাকেজিং, পরিবহন, বিপণনসহ পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়বে। কমবে কর্মসংস্থান ও দক্ষ জনবল তৈরির সুযোগও। তাদের মতে, নাট-বোল্ট-স্ক্রু ছোট পণ্য হলেও ভবন, সেতু, শিল্পযন্ত্র, যানবাহন ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জামে এর ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। নিম্নমানের বা অজানা উৎসের পণ্য ব্যবহারে যন্ত্রপাতি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

স্থানীয় উৎপাদক ও বৈধ আমদানিকারকদের দাবি, শুধু সীমান্তে চোরাচালান বন্ধ করলেই হবে না; আমদানির সময় এইচএস কোড, মূল্য, পরিমাণ, ওজন ও ঘোষণার সঙ্গে প্রকৃত পণ্যের মিল কঠোরভাবে যাচাই করতে হবে। সন্দেহজনক চালান শতভাগ কায়িক পরীক্ষা, আমদানি মূল্যের অস্বাভাবিক পার্থক্য বিশ্লেষণ এবং বারবার ভুল ঘোষণা দেওয়া প্রতিষ্ঠানকে ঝুঁকিপূর্ণ আমদানিকারক হিসেবে নজরদারির আওতায় আনার দাবিও জানিয়েছেন তারা। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতকে এগিয়ে নিতে দেশীয় উৎপাদক, বৈধ আমদানিকারক ও বিদেশি পণ্যের মধ্যে সমান ও আইনসম্মত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি।