দেশের শীর্ষ শিল্পগ্রুপ টিকে গ্রুপের মালিকানাধীন সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসির বর্তমানে ন্যাফথা থেকে বছরে ৫ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও বিপিসির প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই আরও ১৫ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। দেশের বৃহত্তম এ রিফাইনারির নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে এবং আগামী মার্চে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পটির অনুমোদনের জন্য প্রায় দুই বছর আগে বিপিসির কাছে আবেদন করলেও তা নাকচ হয়। পরে চলতি বছরের শুরুতে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে নতুন করে আবেদন করে টিকে গ্রুপ। তবে এ আবেদন অনুমোদন করা হলে বিপিসির অধীন ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট প্রকল্প বাস্তবায়ন ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ কারণে প্রায় সাত মাস পেরিয়ে গেলেও জ্বালানি বিভাগ এখনো আবেদনটি অনুমোদন করেনি।
সুপার পেট্রোকেমিক্যাল ২০১৩ সালের জুলাইয়ে চট্টগ্রামের জুলদায় উৎপাদনে আসে। প্রতিষ্ঠানটি আমদানিকৃত ন্যাফথা ও কনডেনসেট পরিশোধনের মাধ্যমে ডিজেল ও অকটেন উৎপাদন করে, যা বিপিসিকে সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক পরিশোধন সক্ষমতা ৫ লাখ টন এবং দৈনিক ন্যাফথা প্রসেসিং সক্ষমতা ১৬ হাজার ৭০০ ব্যারেল। এ ছাড়া রয়েছে দুটি কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেটিং প্লান্ট। জ্বালানি তেল সংরক্ষণে বিদ্যমান ট্যাংক টার্মিনালের সক্ষমতা ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৫০ টন। এর সঙ্গে আরও ১ লাখ ৮৪ হাজার টন স্টোরেজ সক্ষমতা নির্মাণাধীন রয়েছে। প্রকল্পটি শেষ হলে মোট স্টোরেজ সক্ষমতা প্রায় ৩ লাখ টনে উন্নীত হবে। পাশাপাশি নতুন সক্ষমতায় দৈনিক আরও ৩৫ হাজার ব্যারেল পরিশোধন ক্ষমতা যুক্ত হবে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির মোট পরিশোধন সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াবে ৫১ হাজার ৭০০ ব্যারেলে।
তথ্যমতে, সম্প্রসারিত রিফাইনারির সক্ষমতা ১৭ লাখ টন। সব মিলিয়ে রিফাইনারি ও স্টোরেজ সক্ষমতা দাঁড়াবে ২২ লাখ টনে। এতে দেশের সবচেয়ে বড় রিফাইনারিতে পরিণত হবে। বর্তমানে সুপার রিফাইনারির প্রধান পণ্য অকটেন। পাশাপাশি সীমিত পরিসরে ডিজেলও উৎপাদন করছে। তবে নির্মাণাধীন নতুন রিফাইনারি চালু হলে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন সক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। তখন তাদের প্রধান পণ্যে পরিণত হবে ডিজেল। সেই সঙ্গে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টন ফার্নেস অয়েল উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া মেরিন ফুয়েলসহ জাহাজ ও শিল্প খাতে ব্যবহৃত অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্যও উৎপাদন করা হবে। এ সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করা গেলে দেশের মোট জ্বালানি তেলের চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ প্রায় ৩৪ শতাংশ পর্যন্ত এ রিফাইনারির মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব হবে। এর মধ্যে সম্প্রসারিত রিফাইনারিটি এককভাবে দেশের চাহিদার ২৩ শতাংশ পূরণ করতে পারবে। বিপিসি’র কর্তাকর্তারা বলেন, সুপার পেট্রোকেমিক্যাল ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ‘বেসরকারি পর্যায়ে রিফাইনারি স্থাপন, অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিপূর্বক মজুত, প্রক্রিয়াকরণ, পরিবহন ও বিপণন নীতিমালা-২০২৩’-এর আলোকে বিদ্যমান রিফাইনারি হিসেবে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত ও প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে উৎপাদিত জ্বালানি তেল নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিপণনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করে। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের নির্দেশনায় বিপিসি একটি কমিটি গঠন করে। এরপর ২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অপারেশন-১ শাখা থেকে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বরের আবেদন নাকচের সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
আবেদনটি নাকচ হওয়ার আড়াই মাস পর, ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব বরাবর নতুন করে আবেদন করেন সুপার পেট্রোকেমিক্যালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৩ ফেব্রুয়ারি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বিপিসির কাছে মতামত চায়। পরে ৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বিপিসির ১০১৭তম বোর্ড সভায় বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়। সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়, ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) ইউনিট-২ প্রকল্প ইতোমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এসপিএম প্রকল্পের পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারি পর্যায়ে জ্বালানি তেল পরিশোধনের সক্ষমতা তিনগুণ বাড়বে। এ কারণে সুপার পেট্রোকেমিক্যালকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাত করে উৎপাদিত জ্বালানি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি আরও গভীরভাবে পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দিয়েছে বিপিসি বোর্ড। একই সঙ্গে বেসরকারি পর্যায়ের ফ্র্যাকসনেশন প্লান্টে সংগৃহীত বা আমদানি করা কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে উৎপাদিত পেট্রল, অকটেন, ডিজেল, কেরোসিন বা এলপিজি সরাসরি অভ্যন্তরীণ বাজারে বাজারজাত করা যাবে না বলেও জানানো হয়।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিপিসির পরিচালক (অপারেশন্স) এ কে মোহাম্মদ সামছুল আহসানের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। জানতে চাইলে বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা বলেন, ‘সুপার পেট্রোকেমিক্যালের প্ল্যান্ট পরিদর্শন করে প্রতিষ্ঠানটির প্রসেসিং সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। রিপোর্ট পাওয়ার পর বিস্তারিত বলা যাবে।’ পরে বিপিসি’র একজন মহাব্যবস্থাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বেসরকারি কোম্পানিগুলো নিজে আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণন করলে বিপিসির অস্তিত্ব থাকবে না। এতে বাজারের নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতে চলে যাবে। ফলে গণমানুষের মাঝে জনর্দুভোগ দেখা দেবে। তিনি আরও বলেন, গঠিত ছয় সদস্যের কমিটি সুপার পেট্রোকেমিক্যালের প্ল্যান্ট সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, প্রসেসিং সক্ষমতা এবং রিফাইনারি স্থাপনের কার্যক্রম যাচাই করবে। সাত দিনের মধ্যে কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। তখন বিস্তারিত জানা যাবে।
এ বিষয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন অ্যান্ড প্লানিং) মোস্তাফিজার রহমান বলেন, বেসরকারি রিফাইনারি অবৈধভাবে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে তা অন্যায়। যদি কোনোভাবে তারা অনুমোদনও পায়, তখন তাদের শর্ত দিতে হবে লোকাল চাহিদা অনুসারে সরবরাহ করতে। বাকি উৎপাদিত জ্বালানি তারা বিদেশে নিজস্ব উদ্যোগে রপ্তানি করবে। এভাবে হলে তাদের উৎপাদন আমাদের ঝুঁকিতে ফেলতে পারবে না। তখন তাদের জন্য পৃথক রেগুলেটরি নিয়ন্ত্রণ দরকার হবে। তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশে রিফাইনারি মানে তেল পরিশোধন করা। কিন্তু আমাদের পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের চাহিদা আছে, যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম উৎপাদন হচ্ছে। এক্ষেত্রে বেসরকারি রিফাইনারিগুলো পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য উৎপাদনে মনোযোগী হতে পারে।
অপরদিকে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলপির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা হায়দারের ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে চট্টগ্রামে উনার অফিসে যোগাযোগ করা হলে তিনি অফিসে নেই বলে জানানো হয়। ফলে উনার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এদিকে এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য ঢাকার কারওয়ান বাজারে অবস্থিত সুপার পেট্রোকেমিক্যাল অফিসে গিয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা হায়দারের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করতে গেলেও তিনি প্রতিবেদকের সঙ্গে দেখা করেননি। প্রতিষ্ঠানটির এইচআর অ্যান্ড অ্যাডমিনের সহকারী ম্যানেজার মাহমুদুল্লাহ আলগালিব কি বিষয়ে প্রশ্ন তা হোয়াটসঅ্যাপে দিতে বলেন। সেই মোতাবেক তার ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে দুটি প্রশ্ন পাঠানোর পরও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। প্রশ্ন দুটি ছিল, ১. অনুমোদন পাওয়ার আগেই কোম্পানিটির এত বড় রিফাইনারি করার কারণ কি? ২. সুপার রিফাইনারি অনুমোদন না পেলে তারা কি করবেন? এত বড় বিনিয়োগের তখন কি হবে?
এ প্রসঙ্গে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের একজন কর্মকর্তা বলেন, বিগত সরকার ২০২১ সালে সিআরইউ-ভিত্তিক ফ্র্যাকসনেশন প্লান্ট ও বেসরকারি রিফাইনারিগুলোকে কনডেনসেট (লাইন ক্রুড) আমদানির অনুমতি দেয়। এতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের রিফাইনারি স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা এবং অন্যান্য যোগ্যতার বিষয়ে বিভিন্ন শর্ত নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে বেসরকারি রিফাইনারিতে উৎপাদিত জ্বালানি তেল বাজারজাত ও সরকারের কাছে সরবরাহের ক্ষেত্রেও একটি কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। মূলত সরকারের দেওয়া এ সুযোগের আলোকেই রিফাইনারি সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা বছরে ৬৫ লাখ মেট্রিক টন। যার মধ্যে আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের মাধ্যমে ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে ১৫ লাখ টন সরবরাহ করতে পারে। এর বাইরে বিপিসির জন্য চারটি বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল সরবরাহকারী নিজস্ব রিফাইনারিতে তেল উৎপাদন করে সরবরাহ করে, যার একটি হলো সুপার পেট্রোকেমিক্যাল।
