১০০০ কোটির মধ্যে বিনিয়োগ মাত্র ৪৩ কোটি টাকা

স্টার্ট‌আপ ফান্ড

বেকার সমস্যা সমাধানে উদ্ভাবনী ও নতুন উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। তবে নতুন উদ্যোগ বা ব্যবসা শুরুর জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা তহবিল সংকট। বিনিয়োগের জন্য গঠিত স্টার্ট‌আপ ফান্ডে এক হাজার কোটি টাকার বেশি পড়ে থাকলেও তা কাজে লাগানো হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এই ফান্ড থেকে গত সাড়ে চার বছরে বিনিয়োগ হয়েছে মাত্র ৪৩ কোটি টাকা। উদ্ভাবনী উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে তিন বছর আগে ২০২১ সালের মার্চে বিনা জামানতে মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়াতে ‘স্টার্টআপ ফান্ড’ নামে ৫০০ কোটি টাকার একটি পুনরর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়। একই সঙ্গে প্রতি ব্যাংকের নিট মুনাফা থেকে ১ শতাংশ আলাদা রেখে নিজস্ব স্টার্টআপ তহবিল গঠন করতে বলা হয়। ব্যাংকগুলো সব মিলিয়ে ৫০৫ কোটি টাকার ফান্ড গঠনও করেছে।

দুটি মিলিয়ে গত আগস্ট পর্যন্ত স্টার্টআপে ঋণ দেওয়ার জন্য গঠিত তহবিলের আকার দাঁড়িয়েছে এক হাজার পাঁচ কোটি টাকা। অথচ গত সাড়ে চার বছরে ঋণ বিতরণ হয়েছে মাত্র ২৭ কোটি টাকা। স্টার্টআপ বলতে বাজারজাত করার জন্য নতুন পণ্য, সেবা, প্রক্রিয়া বা প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও অগ্রগতিকে বোঝায়। এ পর্যন্ত শেয়ারট্রিপ, চালডালের মতো হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান স্টার্টআপের বিশেষ কর্মসূচির আওতায় কম সুদের ঋণ পেয়েছে। বিপুল অঙ্কের তহবিল পড়ে থাকলেও ব্যাংকগুলোর অনাগ্রহের কারণে তহবিলের বেশির ভাগই পড়ে আছে।

বর্তমানে যেকোনো উদ্যোগে ঋণ নিতে যেখানে প্রায় সাড়ে ১৬ শতাংশ সুদ গুনতে হচ্ছে। আবার ঋণের বিপরীতে জমি বা অন্য কোনো স্থাবর সম্পত্তি জামানত রাখা লাগে। স্টার্টআপ তহবিল থেকে শুধু ব্যক্তিগত গ্যারান্টি, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ কিংবা কারিগরি প্রশিক্ষণের সনদ ব্যাংকের কাছে জামানত রেখে মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ঋণ নেওয়া যায়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, স্টার্টআপ তহবিল থেকে ঋণ নেওয়ার জন্য আগ্রহী অনেকে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগাযোগ করেছেন। তাদের নিয়ম-কানুন জানিয়ে ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়। ব্যাংকে ঘুরেও ঋণ পাননি অনেকে। স্টার্টআপের আওতায় সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা ঋণ দিতে পারবে ব্যাংক। তা-ও দিতে হবে তিন কিস্তিতে। আবার একটি ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের অন্তত ১০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তাকে দিতে হবে। কাকে ঋণ দেওয়া হয়েছে, ঋণের সঠিক ব্যবহার হলো কি না—এ রকম বিভিন্ন তথ্য ব্যাংকের কাছে সংরক্ষণ করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, স্টার্টআপ একেবারে নতুন উদ্যোগ হওয়ায় ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়াকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে। আবার এ ধরনের কর্মসূচি থেকে ঋণ দিতে গেলে অনেক ধরনের নিয়ম মানতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক কেস ধরে ধরে পরিদর্শন করে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মসূচির আওতায় বিতরণ করা ঋণ গ্রাহক থেকে আদায় হোক বা না হোক, নির্ধারিত সময় শেষে বাংলাদেশ ব্যাংক তার অ্যাকাউন্ট থেকে কেটে নেয়। এসব কারণে উদ্ভাবনী উদ্যোগের জন্য গঠিত তহবিল দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে।’ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী গত আগস্ট পর্যন্ত ৫২টি ব্যাংক নিট মুনাফার ১ শতাংশ হারে দিয়ে ৫০৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকার তহবিল গঠন করেছে। এর মধ্যে ২৭টি ব্যাংক ১৫৩টি প্রকল্পে দিয়েছে মাত্র ৪৩ কোটি টাকা। যদিও গত ডিসেম্বরে এর পরিমাণ ছিল ২৬ কোটি ৯০ লাখ। ২৫টি ব্যাংক এক টাকার ঋণও দেয়নি। ফলে ব্যাংকের নিজস্ব তহবিলেই ৪৬২ কোটি টাকা পড়ে আছে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গঠিত ৫০০ কোটি টাকার পুরোটাই পড়ে আছে।

ঋণের জন্য যারা উপযুক্ত

সম্পূর্ণ নতুন ও সৃজনশীল উদ্যোগের জন্য ঋণ আবেদন করা যায়। বয়স যদি ২১ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে হয়, তাহলে ব্যাংকের শাখায় আবেদন করতে পারেন উদ্যোক্তারা। যে কাজের জন্য তাঁরা ঋণ নিতে আগ্রহী, সেই ব্যবসা পরিচালনা, বাজারজাতসহ কারিগরি বিষয়ে প্রশিক্ষণের সনদ থাকতে হবে। একজন গ্রাহককে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা ঋণ দেওয়া যাবে। তবে পুরো ঋণ একবারে বিতরণ করা যাবে না। প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে কমপক্ষে তিন কিস্তিতে বিতরণ করতে হবে। একই গ্রাহককে একাধিক ব্যাংক বা একের বেশি প্রকল্পের জন্য ঋণ দেওয়া যাবে না।

ঋণ বাড়াতে যা ভাবা হচ্ছে

স্টার্টআপের আওতায় ঋণ বাড়াতে নীতিমালায় শিথিলতাসহ বিভিন্ন বিষয় ভাবছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান বয়সসীমা ২১ থেকে ৪৫ বছরের শর্ত শিথিল করে ৫০ বছর পর্যন্ত বয়সী ব্যক্তিকে ঋণ দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। আবার একজন উদ্যোক্তার ঋণ নেওয়ার সর্বোচ্চ সীমা এক কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে দুই কোটি টাকা করা হতে পারে। এ ছাড়া অন্তত তিন কিস্তিতে ঋণ বিতরণের যে শর্ত রয়েছে, তা তুলে দিয়ে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে কিস্তি অথবা এককালীন বিতরণের সুযোগ রাখা হচ্ছে। স্টার্টআপের সংজ্ঞা পরিবর্তনের মাধ্যমে আরো কিছু বিষয় ঋণের আওতায় আনা হতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সভাপতি ও ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আর এফ হোসেন বলেন, ‘স্টার্ট‌আপে বিনিয়োগ করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ ১০ স্টার্ট‌আপের মধ্যে ৯টাই ফেল করে। তাই ব্যাংকগুলো এখানে বিনিয়োগ করতে চায় না। এসব জায়গায় বিনিয়োগ করার কথা বিভিন্ন ভেঞ্চার ক্যাপিটালের। তারা পুঁজিতে বিনিয়োগ করতে পারে। আর ব্যাংক মূলত ঋণ দেয় বা চলতি ব্যবসায় বিনিয়োগ করে। তাই স্টার্ট‌আপে বিনিয়োগের এই উদ্যোগ সফলতার মুখ দেখেনি। ভবিষ্যতেও দেখবে কি না তাতে সন্দেহ আছে।’

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!