হাসিনার নির্দেশে গুলি, শহিদ ১৫৮১জন

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনে শেখ হাসিনার নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও তার নেতাকর্মীদের বুলেটে ১৫৮১ জন শহিদ হন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু ছিল। এছাড়া, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বিচারবহির্ভূতভাবে ৬ জন হত্যা এবং রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৯৯ জন নিহত ও ৬৯৭৯ জন আহত হন। ২০০৯ সাল থেকে হাসিনার শাসনামলে রাজনৈতিক আন্দোলন দমন ও ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন চালানো হয়। ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ এসব তথ্য তুলে ধরেছে।

গণ-আন্দোলনে হতাহত এবং সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে গুম-খুনের শিকার হওয়া পরিবারের সদস্যরা শেখ হাসিনার এমন শাসনকে হিটলারের সঙ্গে তুলনা করছেন। তাকে ‘লেডি হিটলার’ আখ্যায়িত করে তারা বলেন, ‘স্বৈরাচার শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে ক্ষমতা নিয়েই দেশ ধ্বংসের পরিকল্পনা করে। এরই ধারাবাহিকতায় ফ্যাসিস্ট হাসিনা হিটলারের চেয়েও কোনো অংশে কম অত্যাচার করেনি।’ উল্লেখ্য, অ্যাডলফ হিটলার ইতিহাসের এক ভয়ংকর একনায়কের নাম। তিনি ১৯৩৩ সালে জার্মানির চ্যান্সেলর নির্বাচিত হন। তারই নির্দেশে দেশটির নাৎসি বাহিনী বিরোধী পক্ষের অনেককেই হত্যা করে। প্রতিষ্ঠা করেন একটি সমগ্রতাবাদী ও ফ্যাসিবাদী একনায়কত্ব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বর্বরোচিতভাবে নাৎসিরা ৬০ লাখের বেশি ইহুদিকে খুন করে, যা থেকে অবোধ শিশু ও বৃদ্ধরাও রক্ষা পায়নি।

অধিকার সংগঠনের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনটি তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ভাগে ১ জানুয়ারি থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনামলের উল্লেখযোগ্য বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। দ্বিতীয় ভাগে ৯ আগস্ট থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালের ঘটনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তৃতীয় ভাগে হাসিনা ও অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের জন্য ১০ দফা সুপারিশও করা হয়েছে।

অধিকার সংগঠনের প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো আজ্ঞাবহ হয়ে পড়ে। বিচার বিভাগে দলীয় লোকদের নিয়োগ দিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে কর্তৃত্ববাদী শাসন কায়েম করা হয়। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন এবং স্থানীয় নির্বাচনগুলো অস্বচ্ছ ও বিতর্কিত হয়, জনগণের ভোটাধিকার ক্ষুন্ন হয়। হাসিনার শাসনামলে নাগরিকদের বাক, চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। সাংবাদিকরা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন এবং সাইবার নিরাপত্তা আইন ব্যবহার করে গণমাধ্যম, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নাগরিক স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করা হয়। ২০২৪ সালে নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলন দমনে হাসিনা সরকার ব্যাপক নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞ চালায়। ৫ আগস্ট আন্দোলনকারীদের ক্ষোভের মুখে সরকার পতন হয় এবং শেখ হাসিনা ভারত পালাতে বাধ্য হন। আন্দোলন দমনে পুলিশ, র‌্যাবসহ নিরাপত্তা বাহিনী নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে বহু নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে হত্যা করে। ১৫ জুলাই রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে পুলিশ হত্যা করে, যা পুরো দেশে আন্দোলন ছড়িয়ে দেয়। সরকার ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়। জাতিসংঘের সাঁজোয়া যানও এই সময়ে ব্যবহার করা হয়। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ১৫৮১ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী ৮৩৪ জন নিহত হয়।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে হাসিনা সরকার ব্যাপক সহিংসতা চালায়, যাতে ১০৫ জন শিশু সহ ৮৩৪ জন নিহত হয়। আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়,যার মধ্যে ৫৫০ জনের চোখ নষ্ট হয় এবং অনেকের অঙ্গ কেটে ফেলা হয়। গুলিবিদ্ধ আহতদের হাসপাতাল নেওয়ার সময় পুলিশ এবং আওয়ামী লীগ বাধা দেয়। ঢাকার আশুলিয়ায় পুলিশ আন্দোলনকারীদের লাশ জ্বালিয়ে দেয়। এই সময়ে পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সহায়তায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালানো হয়। ৪৪ পুলিশ সদস্যও নিহত হন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ও বিচার বিভাগসহ সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান সরকারে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়। হাসিনা সরকার নির্বাচন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে একদলীয় প্রহসনমূলক নির্বাচন আয়োজন করে, যা সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ সব স্থানীয় সরকার নির্বাচন ছিল অস্বচ্ছ ও বিতর্কিত, যার মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করা হয়। বিরোধী দলগুলোর নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও মামলা চালানো হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিরোধী দলের নেতা-কর্মী ও ছাত্র-জনতার ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন চালিয়েছে হাসিনা সরকার। নির্বাচনের আগে বিরোধীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা এবং গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে, এবং ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ১ হাজার ৮০০ নেতাকর্মীকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৯৯ জন নিহত এবং ৬৯৭৯ জন আহত হয়েছেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সহিংসতা ও দুর্বৃত্তায়নে জড়িত থাকলেও তারা প্রায়ই দায়মুক্তি ভোগ করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ বাংলাদেশের ২৪ নাগরিককে হত্যা করেছে, যাদের মধ্যে ২১ জন গুলিতে এবং ৩ জন নির্যাতনের মাধ্যমে নিহত হয়েছেন। এছাড়া ২৯ জন আহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে ২৬ জন গুলিবিদ্ধ এবং ২ জন নির্যাতিত। প্রতিবেদনটি ভারতীয় শাসকগোষ্ঠীর আগ্রাসন এবং বাংলাদেশের নির্বাচনি ব্যবস্থার বিপর্যয়ের জন্য তাদের দায়ী করে, এবং হাসিনা সরকারের সঙ্গে ভারতের গোপন চুক্তির বিষয়ে অভিযোগ তোলে।

২০২৪ সালের ৯ আগস্ট থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাসিনা সরকারের মানবতাবিরোধী অপরাধ ও জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে গণহত্যার অভিযোগ দায়ের হয়। এই সময় রাজনৈতিক সহিংসতা বৃদ্ধি পায়, যেখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ ঘটে। শ্রমিকরা বেতন বৃদ্ধি, বকেয়া বেতন পরিশোধ এবং কারখানা খুলে দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ করলেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের সঙ্গে সংঘর্ষে একজন শ্রমিক নিহত হন।

অধিকারের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পুলিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী হাসিনার পতনের পর দেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের নাগরিকদের ওপর হামলার এক হাজার ৪১৫টি অভিযোগের মধ্যে ৯৮ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে রাজনৈতিক এবং ১ দশমিক ৫৯ শতাংশ ঘটেছে সাম্প্রদায়িক কারণে। এই সময়ে ৮৮টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ৭০ জন গ্রেফতার হয়েছে। এই সময়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় মুসলিম সম্প্রদায়ের মাজার ভাঙা ও হামলার ঘটনা ঘটে।

২০২৪ সালের ৯ আগস্ট থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় কমপক্ষে ৯০ জন নিহত ও দুই হাজার ৪৭৮ জন আহত হয়েছেন। ৬ থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে দেশে কোনো সরকার ছিল না। এই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় কমপক্ষে চারজন নিহত হয়েছেন ও ০৯ জন আহত হয়েছেন। অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, ৯ আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে ১৮ জন সাংবাদিক আহত, ছয়জন লাঞ্ছিত, ছয়জন হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন এবং তিনটি পত্রিকা অফিসে আক্রমণ করা হয়েছে।

২০২৪ সালে হাসিনা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বহু ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ১২১ জনকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়েছে এবং কারাগারে ৮৩ ব্যক্তি মারা গেছেন। নারীর প্রতি সহিংসতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে ধর্ষণ, উত্ত্যক্তকরণ এবং যৌন হয়রানি। যদিও আদালত বখাটে কর্তৃক উত্ত্যক্তকরণ এবং যৌন হয়রানির সংজ্ঞা গ্রহণ করেছে, তবুও আইনে তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, ফলে ২০২৪ সালে এই ধরনের ঘটনা বেড়ে গেছে। আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি, যৌতুকের দাবিতে নারীদের ওপর সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এসিড সহিংসতার শিকার বেশিরভাগই নারী ও শিশু।

১০ সুপারিশ : প্রতিবেদনে উল্লেখ করা গণহত্যা ও গুম খুনের বিচারসহ বিভিন্ন সমস্যা নিরসনে ১০ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে-

১.আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সদস্যদের গণহত্যা, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, নির্যাতনসহ অন্যান্য অমানবিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার জন্য বিচারের সম্মুখীন করা।
২.নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু আইন বাস্তবায়ন এবং নির্যাতন বিরোধী জাতিসংঘ সনদ অনুমোদন করা।
৩.গুমকে অবিলম্বে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা এবং গুমের শিকার ব্যক্তিদের ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৪.জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন সংস্কার করা।
৫.কারা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্ত করা।
৬.মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা প্রত্যাহার করা।
৭.সকল নিবর্তনমূলক আইন, যেমন সন্ত্রাস দমন আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করা।
৮.নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ করতে অপরাধীদের গ্রেফতার এবং বিচার করা।
৯.সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপর বিএসএফের নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করতে ভারতীয় শাসকগোষ্ঠীর ওপর চাপ প্রয়োগ করা।
১০.অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত কমিশনগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়ন করা।

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!