সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে অর্থায়ন সহজ করা দরকার

সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে শিল্পকারখানার জন্য অর্থায়ন সহজ ও সাশ্রয়ী করতে হবে। বিশেষ করে কুটির, অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতের কারখানার পক্ষে ঋণ আহরণ প্রক্রিয়া সহজ নয়। এসব শিল্পের ঋণ গ্রহণ প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। সবুজ জ্বালানি ব্যবহার উৎসাহিত করতে প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। সবুজ জ্বালানিসংক্রান্ত যত ধরনের কর্তৃপক্ষ এবং নীতি রয়েছে সেগুলোর মাঝে থাকতে হবে কার্যকর সমন্বয়।

গতকাল মঙ্গলবার বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) আয়োজিত সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। রাজধানীর বনানীতে হোটেল শেরাটন ঢাকায় ‘উন্নয়নের নতুন ধাপে সবুজ প্রবৃদ্ধি কি বাংলাদেশের চালিকাশক্তি হতে পারে?’ শীর্ষক এই সংলাপের আয়োজন করা হয়। সংলাপ সঞ্চালনা করেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান। ‘বাংলাদেশে সবুজ প্রবৃদ্ধি: উন্নয়ন বিকল্প, নীতির সমন্বয় ও রূপান্তরের সমন্বয়’ শিরোমের একটি প্রবন্ধও উপস্থাপন করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এবং ন্যায়সংগত রূপান্তরের ওপর জোর দেন। তিনি অভিযোজন অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন, আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন এখনও মূলত প্রশমনকেন্দ্রিক। প্রায় ৬৫ শতাংশ অর্থায়ন প্রশমনে এবং ৩৫ শতাংশ অভিযোজনে বরাদ্দ করা হয়। তিনি সম্পদের কার্যকর ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানান।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, সবুজ জ্বালানির জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে নীতি সমন্বয়হীনতা, জমির স্বল্পতা ও সুশাসন। সুশাসনের ঘাটতির কারণে চামড়া খাতের জন্য বিগত দুই দশকে একটি কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) স্থাপন করা যায়নি। এজন্য কাউকে জবাব দিতে হয়নি। কারও চাকরি যায়নি। এখন চীনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্প নির্বাচন করা হয়েছে ভুল জায়গায়।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য ড. মনজুর হোসেন বলেন, জলবায়ু ঝুঁকির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য সবুজ রূপান্তর এক ধরনের অস্তিত্বের লড়াই। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির জন্য সবুজ জ্বালানিতে আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে নীতি, অর্থায়নও প্রযুক্তির মতো অনেক বিষয় আছে। রপ্তানি বাণিজ্যে সহায়ক হিসেবে ছোট কারখানা যাতে কমপ্লায়েন্ট হতে পারে সে লক্ষ্যে সবুজ জ্বালানির বিষয়টিকে মূলধারায় আনতে হবে। অর্থায়নের জন্য বন্ড মার্কেট উৎস ব্যবহারের পরামর্শও দেন তিনি।

মূল প্রবন্ধে ড. সেলিম রায়হান জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিবন্ধকতা ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু প্রতিশ্রুতিগুলোকে অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সঙ্গে সমন্বয় করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। নীতিগত সংজ্ঞার ধারাবাহিকতা, খাতভিত্তিক সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং কার্যকর বাস্তবায়ন কাঠামোর ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, একটি উচ্চ-দক্ষ রূপান্তর প্রক্রিয়া পেট্রোলিয়াম, গ্যাস এবং কয়লার ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও ব্যক্তিগত ভোগ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।

আলোচনায় কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ. এইচ. এম. শফিকুজ্জামান রুফটপ সোলারে প্রাথমিক খরচ বেশি থাকার কথা উল্লেখ করে বলেন, মূলধনি ব্যয় মডেলে এক মেগাওয়াটের সিস্টেম স্থাপনে প্রায় ৬ থেকে ৮ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। তিনি প্রাথমিক খরচ কমানোর পাশাপাশি অর্থায়ন ও পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার ওপর জোর দেন।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও নিউএজ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহিম উল্লেখ করেন, রুফটপ সোলার ব্যবসার জ্বালানি খরচ কমাতে পারে। তবে উচ্চ প্রাথমিক বিনিয়োগ, অর্থায়নে সীমিত সুযোগ, করসংক্রান্ত বাধা ও দুর্বল প্রয়োগের কারণে এর বহুল ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ইউএনডিপি বাংলাদেশের প্রজেক্ট ইকোনমিস্ট মেহেরুনা আই. চৌধুরী গ্রিন গ্রোথ ও বাণিজ্যিক সক্ষমতার মধ্যকার সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (সিবিএএম) ও পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক শর্তগুলোর জন্য ব্যবসায়ীদের প্রস্তুত করার ওপর জোর দেন। বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিলের (বিইপিআরসি) পরিচালক ড. হাসান মাহমুদ জ্বালানি দক্ষতা, সংরক্ষণ এবং স্থানীয় প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের গুরুত্ব তুলে ধরেন।